মহাকর্ষ বল

 মহাকর্ষ বল

اِنَّ اللّٰهَ یُمۡسِکُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضَ اَنۡ تَزُوۡلَا ۬ۚ وَ لَئِنۡ زَالَتَاۤ اِنۡ اَمۡسَکَهُمَا مِنۡ اَحَدٍ مِّنۡۢ بَعۡدِهٖ ؕ اِنَّهٗ کَانَ حَلِیۡمًا غَفُوۡرًا ﴿۴۱﴾

ফাতিরঃ৪১
নিশ্চয় আল্লাহ আসমানসমূহ ও যমীনকে ধরে রাখেন যাতে এগুলো স্থানচ্যুত না হয়। আর যদি এগুলো স্থানচ্যুত হয়, তাহলে তিনি ছাড়া আর কে আছে, যে এগুলোকে ধরে রাখবে? নিশ্চয় তিনি পরম সহনশীল, অতিশয় ক্ষমাপরায়ণ। আল-বায়ান

আল্লাহই আসমান ও যমীনকে স্থির রাখেন যাতে ও দু’টো টলে না যায়। ও দু’টো যদি টলে যায় তাহলে তিনি ছাড়া কে ও দু’টোকে স্থির রাখবে? তিনি পরম সহিষ্ণু, পরম ক্ষমাশীল। তাইসিরুল

আল্লাহ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীকে সংরক্ষণ করেন যাতে ওরা স্থানচ্যূত না হয়, ওরা স্থানচ্যূত হলে তিনি ব্যতীত কে ওদেরকে সংরক্ষণ করবে? তিনি অতি সহনশীল, ক্ষমাপরায়ণ। মুজিবুর রহমান

Indeed, Allah holds the heavens and the earth, lest they cease. And if they should cease, no one could hold them [in place] after Him. Indeed, He is Forbearing and Forgiving. Sahih International

  اِنِّیۡ تَوَکَّلۡتُ عَلَی اللّٰهِ رَبِّیۡ وَ رَبِّکُمۡ ؕ مَا مِنۡ دَآبَّۃٍ اِلَّا هُوَ اٰخِذٌۢ بِنَاصِیَتِهَا ؕ اِنَّ رَبِّیۡ عَلٰی صِرَاطٍ مُّسۡتَقِیۡمٍ ﴿۵۶﴾
‘আমি অবশ্যই তাওয়াক্কুল করেছি আমার রব ও তোমাদের রব আল্লাহর উপর, প্রতিটি বিচরণশীল প্রাণীরই তিনি নিয়ন্ত্রণকারী। নিশ্চয় আমার রব সরল পথে আছেন’। আল-বায়ান

আমি নির্ভর করি আল্লাহর উপর যিনি আমার আর তোমাদের রব, এমন কোন জীব নেই যার কতৃত্ব তাঁর হাতে নয়, নিশ্চয়ই আমার রব সরল পথের উপর প্রতিষ্ঠিত। তাইসিরুল

আমি আল্লাহর উপর ভরসা করেছি, যিনি আমার রাব্ব এবং তোমাদেরও রাব্ব; ভূ-পৃষ্ঠে যত বিচরণকারী রয়েছে সবাই তাঁর মুষ্টিতে আবদ্ধ; নিশ্চয়ই আমার রাব্ব সরল পথে রয়েছেন। মুজিবুর রহমান

Indeed, I have relied upon Allah, my Lord and your Lord. There is no creature but that He holds its forelock. Indeed, my Lord is on a path [that is] straight." Sahih International

https://www-hadithbd-com.translate.goog/quran/link/?id=1529&_x_tr_sl=bn&_x_tr_tl=en&_x_tr_hl=en&_x_tr_pto=sc

আল্লাহ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীকে (ধরে) স্থির রাখেন, যাতে ওরা কক্ষচ্যুত না হয়। [১] ওরা কক্ষচ্যুত হলে তিনি ব্যতীত কেউ ওগুলিকে স্থির রাখতে পারে না। [২] তিনি সহনশীল, ক্ষমাপরায়ণ।

[১] كراهة أن تزولا، لئلا تزولا এটি আল্লাহ তাআলার অসীম ক্ষমতা ও সৃষ্টিনৈপুণ্যের বর্ণনা। অনেকে বলেন, উদ্দেশ্য এই যে, আল্লাহর সাথে শিরক করা এত বড় অপরাধ যে, তার ফলে আকাশ ও পৃথিবী নিজ নিজ অবস্থাতে টিঁকে থাকতে পারে না; বরং তা যেন ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। যেমন অন্যত্র বলেছেন, (تَكَادُ السَّمَاوَاتُ يَتَفَطَّرْنَ مِنْهُ وَتَنْشَقُّ الْأَرْضُ وَتَخِرُّ الْجِبَالُ هَدًّا * أَنْ دَعَوْا لِلرَّحْمَنِ وَلَدًا) অর্থাৎ, এতে যেন আকাশসমূহ বিদীর্ণ হয়ে যাবে, পৃথিবী খন্ড-বিখন্ড হবে এবং পর্বতসমূহ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে আপতিত হবে। যেহেতু তারা পরম দয়াময়ের প্রতি সন্তান আরোপ করে। (সূরা মারয়্যাম ১৯:৯০-৯১ আয়াত)[২] অর্থাৎ, এটা আল্লাহ তাআলার অসীম ক্ষমতার সাথে সাথে তাঁর অসীম দয়া এই যে, তিনি আকাশ ও পৃথিবীকে ধারণ করে রেখেছেন এবং তা আপন স্থান হতে নড়াচড়া করতে ও হিলতে দেন না; নচেৎ চোখের পলকে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। কারণ তিনি যদি তাকে ধারণ না করেন ও তার স্থান থেকে নড়াচড়া করতে দেন, তাহলে তিনি আল্লাহ ছাড়া এমন কোন শক্তি নেই, যে তাকে ধারণ করে রাখবে। إن أمسكهما শব্দটিতে إن নাফিয়াহ (নেতিবাচক)। আল্লাহ তাআলা তাঁর উক্ত অনুগ্রহ ও নিদর্শনের বর্ণনা অন্য স্থানেও দিয়েছেন। যেমন (وَيُمْسِكُ السَّمَاءَ أَنْ تَقَعَ عَلَى الْأَرْضِ إِلَّا بِإِذْنِهِ) অর্থাৎ, তিনিই আকাশ স্থির রাখেন, যাতে তাঁর আদেশ ব্যতীত ভূপৃষ্ঠে পতিত না হয়। (সূরা হজ্জ ২২:৬৫) (وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ تَقُومَ السَّمَاءُ وَالْأَرْضُ بِأَمْرِه) অর্থাৎ, তাঁর অন্যতম নিদর্শন এই যে, তাঁরই আদেশে আকাশ ও পৃথিবী প্রতিষ্ঠিত আছে।" (সূরা রূম ৩০:২৫)[৩] অসীম ক্ষমতার অধিকারী হয়েও তিনি বড় সহনশীল। নিজ বান্দাদেরকে কুফরী, শিরক ও পাপ করতে দেখেও তিনি তাদেরকে পাকড়াও করার জন্য তাড়াতাড়ি করেন না; বরং আরো ঢিল দেন। তিনি বড় ক্ষমাশীলও। যখন কেউ তওবা করে তাঁর দরবারে ফিরে আসে এবং লজ্জিত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনার সাথে অনুতাপ প্রকাশ করে, তখন তিনি তাকে ক্ষমা করে দেন।

আল্লাহ যদি মানুষের প্রতি রহমত নাজিল করেন তাহলে কে আছে তার প্রতিরোধকারী?

মহান আল্লাহ যদি পৃথিবীর বুকে স্বীয় রহমত, বরকত, ফজল করমে আমাদেরকে ধরে রাখতে চান; তাহলে বায়ুর উর্ধ্বচাপ, মহাকর্ষের টান উপেক্ষা করে আমাদের পায়ের তলাকে কে আছে এমন যে, পৃথিবীর ভূত্বকের স্পর্শ থেকে আমাদেরকে বন্চিত রাখবে? অআসলে মহান আল্লাহই পৃথিবীর বুকে স্বীয় রহমত, বরকত, ফজল করমে আমাদেরকে ধরে রাখেন-এতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই মহাকর্ষ বা অভিকর্ষ বলে যদি কিছু থেকে থাকে তা স্রেফ “আল্লাহর রহমত” ছাড়া আর কিছুই নয়।

 যাঁরা বিছানায় শুয়ে, বসে কিংবা মাটিতে দাঁড়িয়ে পড়ছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই জানেন মহাকর্ষ কী। অন্তত এটুকু নিশ্চয়ই জানেন, মহাকর্ষের টান না থাকলে এই হয়তো মহাকাশে ভাসতে ভাসতে। আসলে মহাকর্ষই পৃথিবীসহ অন্যান্য গ্রহ, নক্ষত্র ও ছায়াপথের গতি-প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করছে। সূর্যে শক্তি নিঃসরণ বা মহাকাশের দানব কৃষ্ণগহ্বরও তৈরি হচ্ছে ওই বলের কারণেই 

 আমরা জানি, আমাদের চারপাশের জগতে এই বলটা কাজ করছে। কিন্তু অনেকেই হয়তো জানেন না এই বলটা অদ্ভুত। জাত-ধর্মেও অন্যদের চেয়ে আলাদা। অসামাজিক। কারণ, মহাবিশ্বের অন্যান্য মৌলিক বলের প্যাটার্নের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, সেগুলোর সঙ্গে মহাকর্ষের কোনো মিল নেই। প্রথমত, অন্যান্য বলের তুলনায় মহাকর্ষ খুবই দুর্বল। আবার এই বল কখনো বিকর্ষণ করে না, সব সময় আকর্ষণ করে। শুধু কি তাই, কোয়ান্টাম জগতের সঙ্গেও এই বলকে খাপ খাওয়ানো যায় না। মোদ্দা কথা, মহাকর্ষ টানে সবাইকে, কিন্তু অন্যদের সঙ্গে বাঁধনে জড়ায় না। 

অন্য মৌলিক বলগুলোর সঙ্গে খাপ না খাওয়ার ব্যাপারটাও বেশ রহস্যময়। বিজ্ঞানীদের জন্য হতাশাজনকও বটে। কারণ, বিজ্ঞানীরা সবকিছুতে প্যাটার্ন খোঁজেন। অপরূপ মহাবিশ্বের বিচিত্রতা ও জটিলতা দেখলে অভিভূত না হয়ে আমাদের উপায় থাকে না। তার মধ্যে কোনো প্যাটার্ন খুঁজে পাওয়া গেলে বিষয়টা বোঝা যায়। যেমন আপনার পরিচিত কোনো মানুষের কথা চিন্তা করুন। তার ফেসবুক প্রোফাইল দেখলে যতটা না চেনা সম্ভব, তার চেয়ে বেশি চেনা বা বোঝা যাবে তার ইন্টারনেট ব্রাউজিং হিস্ট্রির প্যাটার্ন পরীক্ষা করলে। এভাবে মহাবিশ্বকে বোঝার বা ব্যাখ্যার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এই চেষ্টা করতে গিয়ে দেখা গেছে, মহাকর্ষ অন্য সব বলের এই প্যাটার্নের সঙ্গে খাপ খায় না। 

 সবকিছুকে কোনো প্যাটার্নে খাপ খাওয়ানোর ইচ্ছা পদার্থবিদদের অনেক দিনের। এর একটি কারণ, তাঁরা পদার্থবিজ্ঞানের সবকিছুকে একত্র করে একটিমাত্র তত্ত্বের ভেতরে আনতে চান। অর্থাৎ একটিমাত্র তত্ত্ব দিয়ে মহাবিশ্বের সবকিছু ব্যাখ্যা করতে চান তাঁরা। একে বলা হয় থিওরি অব এভরিথিং বা সবকিছুর তত্ত্ব। এই চাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় বাধা মহাকর্ষ।

কখনো কি ভীষণ বিস্ময়ে ভেবেছেন, আপনি পৃথিবীতে আটকে আছেন কেন? মহাকাশে ছিটকে পড়ছেন না কেন? এর একটিই উত্তর, মহাকর্ষ। এই বলটাই আপনাকে ভূপৃষ্ঠে আটকে রেখেছে। মহাকর্ষ ছাড়া আমরা কেউই পৃথিবীতে আটকে থাকতে পারতাম না, থাকতে হতো মহাশূন্যে ভেসে। অবশ্য তখন মহাবিশ্বও পরিণত হতো ঘন অন্ধকারাচ্ছন্ন ও বিশালাকৃতির গ্যাস আর ধূলিকণায়। মহাকর্ষ না থাকলে গ্রহ, নক্ষত্র, ছায়াপথ বলে কিছু থাকত না। কাজেই বলতেই হচ্ছে, মহাকর্ষের প্রভাব বলেন আর প্রতিপত্তি বলেন, তা বিশাল, বিপুল। অনেক বড় পরিসরের। অথচ মহাবিশ্বের চারটি মৌলিক বলের মধ্যে মহাকর্ষই সবচেয়ে দুর্বল। কিন্তু কতটা দুর্বল?

সেটি শুনলেও অনেকের চোখ কপালে উঠে যেতে পারে। মোটা দাগে বললে, অন্য তিনটি মৌলিক বলের তুলনায় প্রায় ১০৩৬ ভাগ দুর্বল এই মহাকর্ষ। অর্থাৎ ১/১,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০ ভাগ। এত বড় সংখ্যা উপলব্ধি করা সহজ নয়তাই কতিপয় সহজ উদাহরণ নিম্নে দেয়া গেলঃ

উদাহরণ ০১

ধরা যাক, একটা পেঁপেটা কেটে চার ভাগ করলে এর প্রতিটি টুকরা হবে পেঁপেটির একচতুর্থাংশ। পেঁপেটাকে ১০৩৬ ভাগ করা হলে প্রতিটি টুকরোর আকার হবে পেঁপের একটি অণুর চেয়েও ছোট। আর পেঁপের একটি অণুর সমান টুকরার আকার করতে চাইলে আপনাকে প্রায় ২০ লাখ পেঁপে কেটে সমান ভাগে টুকরা করতে হবে।

উদাহরণ ০২

অন্যান্য বলের তুলনায় মহাকর্ষের দুর্বলতা পরিমাপের আরেকটি পরীক্ষা হলো নিম্নরূপঃ

 একটি শুকনা চিরুনি ও ছোট ছোট টুকরা করে কাটা কিছু কাগজ নিই। শুকনা চিরুনিটা দিয়ে মাথার শুকনো চুল কিছুক্ষণ আঁচড়ে কাগজের টুকরার কাছে ধরলে দেখা যাবে, কাগজের টুকরাগুলোকে চিরুনিটা আকর্ষণ করছে। কিছু কাগজ চিরুনির সঙ্গে লেগেও যাবে। এর কারণ স্থির বিদ্যুৎ। চিরুনির সামান্য বিদ্যুৎচৌম্বকীয় বলও কাগজের টুকরাগুলোকে চিরুনির সঙ্গে আটকে রাখে। অথচ কাগজের টুকরাগুলোর ওপর পৃথিবীর মহাকর্ষ কাজ করছে। কিন্তু গোটা পৃথিবীর মহাকর্ষও চিরুনির সেই আকর্ষণ ঠেকাতে পারছে না। এতে বোঝা যায়, বিদ্যুৎচৌম্বকীয় বলের তুলনায় মহাকর্ষ কত দুর্বল! এটা চিন্তনীয় বিষয় যে, একটি ছোট চুম্বক লোহাজাতীয় কিছুর কাছে ধরলে তা বিশাল পৃথিবীর মহাকর্ষ কত দূর্বল! 

মহাকর্ষ বলের দূর্বলতা নিয়ে কতিপয় স্বাভাবিক প্রশ্নাবলী

প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, ক) মহাকর্ষ যদি এত দুর্বলই হয়, তাহলে মহাবিশ্বে তার গুরুত্ব আসলে কী?

খ) শক্তিশালী অন্য বলের কাছে মহাকর্ষ কি ধরাশায়ী হতো না?

গ) আর গ্রহ আর নক্ষত্রগুলোকে মহাকর্ষ কীভাবে নির্দিষ্ট কক্ষপথে ধরে রেখেছে?

ঘ) অন্যান্য বলের প্রভাবে সেগুলো ছিটকে যাচ্ছে না কেন? কিংবা অন্য বলগুলো যদি এতই শক্তিশালী হয়, তাহলে তারা মহাকর্ষের ওপরে প্রভাব বিস্তার করে মহাকর্ষ বলকে মহাবিশ্ব থেকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে পারছে না কেন?

কেবল বৃহৎ পরিসরেই মহাকর্ষ গুরুত্বপূর্ণ!

দুর্বল ও সবল পারমাণবিক বল কাজ করে কেবল অতিক্ষুদ্র পরিসরে। কাজেই এ দুটি বলের সিংহভাগই শুধু অতিপারমাণবিক পরিসরে উপলব্ধি করা যায়। ফলে, গ্রহ, নক্ষত্র ও ছায়াপথের চলাফেরায় বিদ্যুৎচৌম্বকীয় বলের বড় কোনো ভূমিকা নেই। কারণ, বিদ্যুৎচৌম্বকীয় বল দ্বিমুখী। অর্থাৎ বিদ্যুৎচৌম্বকীয় বলের সঙ্গে দুই ধরনের বৈদ্যুতিক চার্জ জড়িত। ধনাত্মক ও ঋণাত্মক। একইভাবে দুর্বল ও সবল পারমাণবিক বলেরও বৈদ্যুতিক চার্জের মতো ধর্ম রয়েছে, যাদের বলা হয় হাইপারচার্জ ও কালার। এগুলোর মানও ভিন্ন ভিন্ন।এর কারণ, বিদ্যুৎচৌম্বকীয় বলের সঙ্গে দুই ধরনের বৈদ্যুতিক চার্জ জড়িত। ধনাত্মক ও ঋণাত্মক। একইভাবে দুর্বল ও সবল পারমাণবিক বলেরও বৈদ্যুতিক চার্জের মতো ধর্ম রয়েছে, যাদের বলা হয় হাইপারচার্জ ও কালার। এগুলোর মানও ভিন্ন ভিন্ন।

পক্ষান্তরে বড় পরিসরে মহাকর্ষ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আবার বিপুল ভরের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ এই বল। মহাকর্ষ একমুখী। তাই মহাকর্ষ শুধু বস্তুকে আকর্ষণ করে বা টানে, বিকর্ষণ করে না।  অন্যদিকে মহাকর্ষের মান সংশ্লিষ্ট বস্তুর ভরের সঙ্গে সম্পর্কিত। অবশ্য মহাকর্ষকেও অন্য বলগুলোর মতো ভাগ করা যায়। অর্থাৎ বস্তুর ভরকে মহাকর্ষের চার্জ হিসেবে কল্পনা করা যায়, যার মাধ্যমে বস্তুটি কতটুকু মহাকর্ষ অনুভব করবে, তা নির্ধারিত হবে। কিন্তু সমস্যা হলো, মহাবিশ্বে শুধু এক ধরনের ভরই দেখা যায়। ঋণাত্মক বা নেগেটিভ ভর বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। কাজেই কোনো কণা বা বস্তুকে মহাকর্ষ বিকর্ষণ করে না।

বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এর মানে দাঁড়ায়, মহাকর্ষকে বাতিল করা যায় না। কিন্তু বৃহৎ পরিসরে বিদ্যুৎচৌম্বকীয় বলের ক্ষেত্রে তা ঘটতে দেখা যায়। সূর্যের বেশির ভাগ যদি ধনাত্মক বৈদ্যুতিক চার্জ দিয়ে গঠিত হতো এবং পৃথিবী যদি বেশির ভাগ ঋণাত্মক চার্জ দিয়ে গঠিত হতো, তাহলে এই দুইয়ের মধ্যে যে আকর্ষণ দেখা যেত, তার পরিমাণ হতো বিপুল। তাহলে আমাদের গ্রহটাকে অনেক আগেই সূর্য গিলে ফেলত। কিন্তু পৃথিবী গঠিত হয়েছে প্রায় সমপরিমাণ ধনাত্মক ও ঋণাত্মক চার্জ দিয়ে। আবার সূর্যও গঠিত হয়েছে সমপরিমাণ ধনাত্মক ও ঋণাত্মক চার্জে। তাই তারা বিদ্যুৎচৌম্বকীয়ভাবে পরস্পরকে সেভাবে প্রভাবিত করে না। পৃথিবীর প্রতিটি ধনাত্মক ও ঋণাত্মক কণার উভয়েই সূর্যের ধনাত্মক ও ঋণাত্মক কণা দিয়ে আকর্ষিত ও বিকর্ষিত হয়। তাই সব বিদ্যুৎচৌম্বকীয় বল বাতিল হয়ে যায়। 

পক্ষান্তরে, দুর্বল ও শক্তিশালী পারমাণবিক বল বৃহৎ পরিসরে কাজ না করায় এক্ষণে চারটি বলের মধ্যে একটি বলই বাকি থাকে, আর সেটি হলো মহাকর্ষ। এ কারণে গ্রহ, নক্ষত্র ও ছায়াপথগুলোকে বৃহৎ পরিসরেও নিয়ন্ত্রণ করে মহাকর্ষ। কারণ, অন্যান্য বল ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় থাকে। আর মহাকর্ষ আকর্ষণধর্মী হওয়ার কারণে একে কখনো বাতিল করা যায় না। 

সুতরাং মহাকর্ষের দুটি কৌতূহলী ও অমীমাংসিত ধর্ম দেখা যাচ্ছে। প্রথমটা হলো অন্য বলগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে এই বলটা খুবই দুর্বল। দ্বিতীয়ত, বলটা শুধু আকর্ষণ করে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কণার চার্জের ওপর নির্ভর করে দূর্বল ও সবল বলগুলো আকর্ষণ, বিকর্ষণ দুটিই করে। তাই দেখা যাচ্ছে, নানা দিক দিয়ে মহাকর্ষ বেশ অস্বাভাবিক। তাহলে প্রশ্ন আসে, মহাকর্ষ এ রকম আলাদা কেন? এর একমাত্র উত্তর, আমরা জানি না। 

(সূত্রঃ বিজ্ঞানচিন্তা, মার্চ, ২০২৩, https://www.bigganchinta.com/space/7cevg8153r)।

বিঃদ্রঃ পৃথিবী গঠিত হয়েছে প্রায় সমপরিমাণ ধনাত্মক ও ঋণাত্মক চার্জ দিয়ে। আবার সূর্যও গঠিত হয়েছে সমপরিমাণ ধনাত্মক ও ঋণাত্মক চার্জে। তাই তারা বিদ্যুৎচৌম্বকীয়ভাবে পরস্পরকে সেভাবে প্রভাবিত করে না। পৃথিবীর প্রতিটি ধনাত্মক ও ঋণাত্মক কণার উভয়েই সূর্যের ধনাত্মক ও ঋণাত্মক কণা দিয়ে আকর্ষিত ও বিকর্ষিত হয়। তাই সব বিদ্যুৎচৌম্বকীয় বল বাতিল হয়ে যায়। অনুরুপ মাটিতে রয়েছে যেমন আয়রণ, ম্যাগনেশিয়াম তেমন মানব দেহেও রয়েছে অনুরুপ খনিজ উপাদান মাটির আয়রণ, ম্যাগনেশিয়াম নামক ধনাত্মক ও ঋণাত্মক কণার আকর্ষণ-বিকর্ষণ অআর দেহের আয়রণ, ম্যাগনেশিয়াম নামক ধনাত্মক ও ঋণাত্মক কণার আকর্ষণ-বিকর্ষণে বাতিল হয়ে যায় পৃথিবীর ভূত্বকে আমাদের ধরে রাখার ক্ষেত্রে মধ্যাকর্ষণ (অভিকর্ষ বল) শক্তির সক্ষমতা ।

 মহাকর্ষের প্রস্তাবিত নাম হতে পারে সুপার স্ট্রেন্জ ফোর্স (S.S.F)!

মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় বিষয় হতে পারে মহাকর্ষ। প্রত্যেক বিষয়ের কোনো না কোনো প্রকারে একটা যুক্তি খাড়া করা যায় ব্যতিক্রম মহাকর্ষ ও তার প্রতি বল গ্রাভিটন। তাই স্ট্রেন্জ কোয়ার্কের মতই মহাকর্ষের নাম দেয়া যেতে পারে স্ট্রেন্জ ফোর্স। 

সব কণা, পদার্থ এবং অন্য তিনটি মৌলিক বলকে ব্যাখ্যা করা হয় কোয়ান্টাম মেকানিকসের মাধ্যমে। কোয়ান্টাম মেকানিকসে সবকিছুকে কণা হিসেবে বর্ণনা করা হয়। এমনকি বলগুলোকেও কণা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয় এ তত্ত্বে। যেমন একটি ইলেকট্রন আরেকটি ইলেকট্রনকে ধাক্কা দেওয়ার কারণে দ্বিতীয় ইলেকট্রনটির যে চলাচল হয়, তার জন্য কোনো বল বা অদৃশ্য কোনো প্রভাব ব্যবহার করা হয় না। বরং পদার্থবিদেরা মনে করেন, এই মিথস্ক্রিয়ার কারণ একটি ইলেকট্রন আরেকটি ইলেকট্রনের দিকে একটি কণা ছুড়ে দেয়, যার মাধ্যমে তার কিছু ভরবেগ স্থানান্তরিত হয়। ইলেকট্রনের ক্ষেত্রে বলবাহী এই কণাকে বলা হয় ফোটন। অন্যদিকে দুর্বল বলের বলবাহী কণার নাম ডব্লিউ ও জেড বোসন। এই বলবাহী কণা বিনিময়ের মাধ্যমে দুর্বল বল কাজ করে। আর শক্তিশালী বল বিনিময় হয় গ্লুয়ন কণার মাধ্যমে।

কোয়ান্টাম মেকানিকসের এই কাঠামোকে বলা হয় কণাপদার্থবিজ্ঞানের স্ট্যান্ডার্ড মডেল। এই মডেল প্রাকৃতিক জগতের অধিকাংশকে ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে অবিশ্বাস্য রকম সফল। কোয়ান্টাম কণার দৃষ্টিভঙ্গিতে জগতের অনেক কিছু ব্যাখ্যা করা যায়। এমনকি আমরা আগে দেখিনি এমন অনেক কিছুর ভবিষ্যদ্বাণীও করা যায়। যেমন এই মডেল ব্যবহার করেই হিগস বোসন কণার ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল। লার্জ হ্যাড্রন কলাইডারে ২০১২ সালে কণাটি শনাক্ত করাও সম্ভব হয়েছে। আবার দুর্বল বল কেন ক্ষুদ্র পরিসরে কাজ করে, তার ব্যাখ্যাও পাওয়া যায় এ মডেল থেকে। আসলে এ বলবাহী কণার ভর অনেক বেশি। সে কারণে কণাটির চলাচল সীমাবদ্ধ। এত সফলতা সত্ত্বেও স্ট্যান্ডার্ড মডেলের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, একই উপায়ে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। কিন্তু কেন?

কোয়ান্টাম মেকানিকসের মাধ্যমে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা না করতে পারার দুটো কারণ রয়েছে। প্রথমত স্ট্যান্ডার্ড মডেলে মহাকর্ষকে খাপ খাওয়াতে গেলে মহাকর্ষও কোনো কণার মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয় বলে কল্পনা করে নিতে হয়। পদার্থবিদেরা এই হাইপোথেটিক্যাল কণার একটি গালভরা নামও দিয়েছেন—‘গ্র্যাভিটন’। বাংলায় বলা যায় মহাকর্ষ কণা। এ কণার অস্তিত্ব যদি সত্যিই থাকে, তাহলে আপনি শুয়ে, বসে বা দাঁড়িয়ে যেখানেই থাকুন না কেন, আপনার দেহ থেকে অনবরত অতিক্ষুদ্র বলের মতো গ্র্যাভিটন কণা ছুটে যাচ্ছে ভূপৃষ্ঠের দিকে। আবার ভূপৃষ্ঠ থেকেও একই রকম কোয়ান্টাম কণা ছুটে আসছে আপনার দিকে। এই দুই মহাকর্ষ কণা বিনিময়ের কারণে আপনি পৃথিবীর বুকে আটকে থাকতে পারছেন। আবার পৃথিবী যে সূর্যের চারদিকে ঘুরে বেড়াতে পারছে, তার কারণও ওই গ্র্যাভিটন কণার অবিরাম স্রোত দুইয়ের মধ্যে বিনিময় হচ্ছে। এভাবে মহাকর্ষকে বেশ ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু এ ধারণার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো গ্র্যাভিটনের অস্তিত্ব পুরোটাই কাল্পনিক। বাস্তবে এ রকম কোনো কণার খোঁজ আজও পাওয়া যায়নি। অন্য বলগুলোর সঙ্গে মহাকর্ষের এই আপাত–অসংগতির অর্থ হতে পারে, আমরা যে প্যাটার্ন আবিষ্কার করেছি, সেটি সঠিক নয়, অথবা বড় কোনো কিছু আমরা এখনো বুঝতে পারছি না। কোনটা ঠিক? তা–ও অমীমাংসিত।

দ্বিতীয় কারণটি হলো, মহাকর্ষকে ব্যাখ্যার জন্য আমাদের কাছে চমৎকার ও কার্যকর একটি তত্ত্ব আছে। সাধারণ আপেক্ষিকতা। ১৯১৫ সালে তত্ত্বটি প্রণয়ন করেন আইনস্টাইন। তারপর থেকে নানাভাবে নিজের সফলতার পরিচয় দিয়েছে আপেক্ষিকতা তত্ত্ব। এ তত্ত্বে মহাকর্ষকে দুটি বস্তুর মধ্যে কোনো বলের টান হিসেবে ভাবা হয় না, বরং ভাবা হয় স্থানের বিকৃতির ফল হিসেবে। এর মানে কী? আইনস্টাইন স্থানকে পরম না ধরে গতিশীল প্রবাহ বা নমনীয় চাদরের মতো করে কল্পনা করলেন। এভাবে মহাকর্ষকে সরলভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। এ তত্ত্ব বলে, কোনো বস্তু বা শক্তির উপস্থিতিতে তার চারপাশের নমনীয় চাদরের মতো স্থান বেঁকে যায়। এতে বস্তুটির কাছের বস্তুগুলোর গতিপথ বদলে যায়। আইনস্টাইনের চিত্রমতে, মহাকর্ষ বল বলে কিছু নেই, আসলে পুরোটাই স্থানের বিকৃতি বা বক্রতার ফল।

নিউটন বলেছিলেন, মহাকর্ষ বলের টানে পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘুরছে। কিন্তু আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা অনুযায়ী, পৃথিবী সে কারণে সূর্যের চারপাশে ঘুরছে না। এর আসল কারণ সূর্য তার চারপাশের স্থানকে বাঁকিয়ে দিয়েছে। তাই পৃথিবীর কাছে যেটা সরলপথ, সেটি আসলে একটি বৃত্তাকার পথ (বা উপবৃত্তাকার) বলে মনে হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে মহাকর্ষীয় ভর কোনো চার্জ নয়, বরং কোন বস্তু তার চারপাশের স্থানকে কতটুকু বক্র করতে পারে তার পরিমাণ। তত্ত্বটাকে যতই উদ্ভট বলে মনে হোক না কেন, এটা স্থানীয় মহাকর্ষ, মহাজাগতিক মহাকর্ষ এবং মহাবিশ্বের অনেক অদ্ভুত পরিঘটনা সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে। এ তত্ত্ব ব্যাখ্যা করে, আলো কেন বস্তুর চারপাশে বেঁকে যায় এবং আপনার জিপিএস কেন কাজ করে। এমনকি কৃষ্ণগহ্বরের ভবিষ্যদ্বাণী করে তত্ত্বটি।

সমস্যা হলো সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব বেশ ভালোভাবে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা করতে পারে। তাই আমাদের ধারণা হয়েছে, এটাই সম্ভবত প্রকৃতির সঠিক ব্যাখ্যা। ঝামেলা হলো এ তত্ত্বটাকে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার মতো অন্য কোনো মৌলিক তত্ত্বের সঙ্গে একত্র করা সম্ভব হয়নি। অথচ কোয়ান্টাম মেকানিকসও প্রকৃতির সঠিক ও নির্ভুল ব্যাখ্যা করতে পারে বলে আমরা মনে করি।

সমস্যাটার কারণ কোয়ান্টাম মেকানিকস অনুযায়ী, মহাবিশ্বের চিত্র একটু আলাদা। এ তত্ত্বে স্থানকে সমতল পটভূমি হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু সাধারণ আপেক্ষিকতা অনুসারে, স্থান গতিশীল ও নমনীয়, যা সময়ের সঙ্গে মিলে স্থান-কাল গঠন করে। কাজেই বস্তুর ভর বা শক্তি স্থান-কালকে বাঁকিয়ে দিতে পারে। তাহলে প্রশ্ন আসে, কোন চিত্রটা সঠিক? মহাকর্ষ কি স্থানের বক্রতা নাকি কণার মধে৵ অজানা উড়ন্ত কোয়ান্টাম বল? মহাবিশ্বের সবকিছুই আসলে কোয়ান্টাম মেকানিকসের নিয়ম মেনে চলে। তাই মহাকর্ষও যদি সেই নিয়ম মেনে চলে, তাহলে বিষয়টা আমাদের জন্য বোধগম্য হয়ে উঠত। কিন্তু গ্র্যাভিটন বা মহাকর্ষ কণা এখন পর্যন্ত কাগজে–কলমেই সীমাবদ্ধ। গ্র্যাভিটন নামের কোনো কোয়ান্টাম কণার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।

অসীমের পথে কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি বা কোয়ান্টাম মহাকর্ষ তত্ত্ব!

কোয়ান্টাম মেকানিকস এবং আপেক্ষিকতার মিলনে নতুন যে তত্ত্ব পাওয়া যাবে, তার পোশাকি নাম কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি বা কোয়ান্টাম মহাকর্ষ। কিন্তু সমস্যা হলো সেটি কেমন হবে? কেউ জানে না। পদার্থবিজ্ঞানীরা মাঝেমধ্যে তাত্ত্বিকভাবে এ ধরনের কণার ভবিষ্যদ্বাণী করেন, পরে সেগুলো পরীক্ষামূলকভাবে পাওয়া যায়। সম্প্রতি লার্জ হ্যাড্রন কলাইডারে পাওয়া হিগস বোসন এমন একটি কণা। কিন্তু কোয়ান্টাম মেকানিকস আর আপেক্ষিকতাকে একীভূত করতে পদার্থবিদেরা এখন পর্যন্ত যতবার চেষ্টা করেছেন, ততবারই ব্যর্থ হয়েছেন। এসব চেষ্টায় অসীমের মতো কিছু ফল পাওয়া গেছে।

কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি বা কোয়ান্টাম মহাকর্ষ তত্ত্ব রচনায় আমরা কী করছি?

আশার কথা হলো, তাত্ত্বিকেরাও কম যান না। তাঁরাও নাছোড়বান্দার মতো লেগে থাকেন। তাই একদিন হয়তো ভালো কোনো আইডিয়া তাঁদের মাথায় উঁকি দিতেও পারে, যার মাধ্যমে এই বিপরীতধর্মী তত্ত্ব দুটিকে একত্র করা যাবে। তাঁদের এসব চেষ্টার ফসলের মধ্যে রয়েছে স্ট্রিং থিওরি এবং লুপ কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি। তবে এই তত্ত্ব দুটি সঠিক কি না, তা–ও আমরা জানি না। কারণ সেগুলো পরীক্ষা করে দেখাও কঠিন। তত্ত্ব দুটি পরীক্ষামূলকভাবে সত্যি প্রমাণ করতে আমাদের অবিশ্বাস্য রকম বড় পার্টিকেল অ্যাকসিলারেটর দরকার। একেকটা অ্যাকসিলারেটরের আকৃতি হবে আমাদের সৌরজগতের সমান। সেটি এই মুহূর্তে আমাদের পক্ষে বানানো অসম্ভব।

সংপেক্ষে বল্য যায়, মহাকর্ষ বল তার সঙ্গীদের চেয়ে একেবারেই আলাদা। মহাবিশ্বের অন্যতম বড় রহস্য এটা। এই জটিল ধাঁধা সমাধানে আমরা কী করছি?   

মহাবিশ্ব কীভাবে কাজ করে

মহাবিশ্ব কীভাবে কাজ করে, তা বোঝার একটি পন্থা হলো ক) পরীক্ষা করে দেখা এবং তারপর চৌকস কোনো আইডিয়া দিয়ে তার পর্যবেক্ষণকে ব্যাখ্যা করা। সে হিসেবে আমরা সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব এবং কোয়ান্টাম মেকানিকসের মধ্যে কোনটা সঠিক এবং কোনটা অকার্যকর, তা পরীক্ষা করে দেখতে পারি। যেমন আমরা যদি পরীক্ষা করে দেখতে পাই, দুটি বস্তু পরস্পরের মধ্যে গ্র্যাভিটন কণা বিনিময় করছে, তাহলে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হবে যে মহাকর্ষ হলো কোয়ান্টাম পরিঘটনা।

সেটি সম্ভব হলে অবশ্যই অনেক বড় ঘটনা হতো। কিন্তু এই পরীক্ষা করা খুবই জটিল, কারণ, মহাকর্ষ চারটির মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল বল। এমনকি ক্ষুদ্র একটি চুম্বকের বিদ্যুৎচৌম্বকীয় বলের ওপর আধিপত্য বিস্তার করার জন্য গোটা পৃথিবীর মহাকর্ষও যথেষ্ট নয়। ওই ক্ষুদ্র চুম্বকের বলের কাছেও পৃথিবীর মহাকর্ষ হেরে যায়। দুটি কণাকে একসঙ্গে রাখা হলে সেগুলোর মধ্যকার মহাকর্ষ বল প্রায় শূন্য হতে দেখা যায়। আর তখন সেখানে বিদ্যুৎচৌম্বকীয়, দুর্বল ও সবল পারমাণবিক বল অনেক বেশি শক্তিশালী।

গ্র্যাভিটন কণা দেখার সম্ভাব্য বৈজ্ঞানিক উপায়

প্রস্তাবিত গ্র্যাভিটন কণা দেখার জন্য আমাদের অনেক ভারী বস্তু দরকার। সেই বস্তুগুলোর হতে হবে মহাজাগতিক ভরের, যাতে অন্য বলগুলো ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় থাকবে। এই অতিভারী বস্তুকে পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষের মুখে ফেললেই গ্র্যাভিটন বা মহাকর্ষ কণা পর্যবেক্ষণ করার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। সে জন্য হাতের কাছে যেকোনো বস্তু টনকে টন জড়ো করে, তা দিয়ে অতিভারী বস্তু তৈরি করে সংঘর্ষ ঘটালে হবে না। আমাদের দরকার দানবীয় অতিভরের কোনো কৃষ্ণগহ্বরের মতো বস্তু বা দুটি কৃষ্ণগহ্বরের সংঘর্ষ।

আমাদের সক্ষমতার দৌড় কত?

এ রকম মহাজাগতিক অতিভারী দুটি বস্তুর মধ্যে সংঘর্ষ ঘটিয়েই কেবল মহাকর্ষকে হয়তো কোয়ান্টাম পরিঘটনা হিসেবে প্রমাণ করা সম্ভব। কিন্তু আমরা ভালো করেই জানি, এ রকম কিছু করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব। আমাদের বাজেট বলেন আর সামর্থ্য, কোনোটাতেই কুলাবে না। তার চেয়ে হয়তো মৃত নক্ষত্রের কথা ভাবা অনেক বেশি বাজেটবান্ধব। মজার ব্যাপার হলো, এসব ক্ষেত্রে আমরা ভাগ্যবান। মহাবিশ্বে হরহামেশাই উদ্ভট সব ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। তার মধ্যে আছে কৃষ্ণগহ্বরের সংঘর্ষ। মাঝেমধ্যে এ রকম ঘটনা ঘটে মহাকাশে। ভালোমতো খুঁজলে এমন কিছু হাতের নাগালে পেয়েও যেতে পারেন। তবে এসব ঘটনা আমাদের ইচ্ছেমতো ঘটে না। বারবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তিও হয় না। অবশ্য কৃষ্ণগহ্বরের সংঘর্ষের ঘটনা বেশ কয়েকবার ঘটতে দেখা গেছে। দুটি কৃষ্ণগহ্বর পরস্পরের কাছাকাছি চলে এলে, তারা একে অন্যকে শুষে নিতে বা গিলে ফেলার চেষ্টা করে। ঠিক এ ঘটনাই মহাকাশে খুঁজে দেখেন বিজ্ঞানীরা। Last Edit 25-4-2023

1.       

2.   যেভাবে বিজ্ঞানীরা কল্পিত কণা গ্র্যাভিটন-কে কল্পনা করে থাকেনঃ

3.    

4.     মহাকাশের বিভিন্ন জায়গায় দুটি কৃষ্ণগহ্বর পরস্পরকে কেন্দ্র করে সর্পিলভাবে ঘুরতে শুরু করে ক্রমেই মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়। একসময় দুটির মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ ঘটে। ফলে হয়তো চতুর্দিকে তীব্র বেগে গ্র্যাভিটন কণা বেরিয়ে আসতে পারে। আসলে সেটি ঘটে কি না, তা আমাদের পর্যবেক্ষণ করে দেখতে হবে। কিন্তু ব্যাপারটা অত সহজ নয়। কৃষ্ণগহ্বর থেকে সত্যিই যদি কোনো গ্র্যাভিটন কণা বেরিয়ে আসে, তা–ও শনাক্ত করা খুব কঠিন। মহাকর্ষের দুর্বলতার কারণে আপনার ভেতর দিয়ে গ্র্যাভিটন কণা চলে গেলেও কিছুই টের পাবেন না।

নিউট্রিনোঃ বৈজ্ঞানিক জ্বীন-ভূতের গল্পকথা

পৃথিবীতে আসা নিউট্রিনোদের প্রধান উৎস সূর্য। সেখানে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে অজস্র নিউট্রিনো। প্রতি সেকেন্ডে এদের উৎপন্ন হওয়ার সংখ্যা প্রায় ১০৩৮টি। এই বিপুল সংখ্যক নিউট্রিনোরা সূর্য থেকে ছড়িয়ে পড়ে সবদিকে। বিজ্ঞানীরা হিসেব করে দেখেছেন, আমাদের শরীরের প্রতি বর্গ সে.মি. এলাকা ভেদ করে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১০১২টি নিউট্রিনো চলে যাচ্ছে। এক সেকেন্ড! একটু ভাবুন তো, বিজ্ঞানীরা কীভাবে সূর্য থেকে উৎপন্ন বা আমাদের শরীর ভেদ করে চলে যাওয়া এসব নিউট্রিনোর সংখ্যা গুনলেন? এরা তো প্রায় কোনো কিছুর সঙ্গেই বিক্রিয়া করে না। তাহলে কোন জাদু বলে এদের সংখ্যা নির্ধারণ করলেন বিজ্ঞানীরা?

সূর্য থেকে আসা নিউট্রিনোদের সংখ্যা নির্ধারণে বিজ্ঞানীদের প্রথম চেষ্টা ছিল পুরোপুরি তাত্ত্বিক। এ জন্য তাঁরা ব্যবহার করেন ‘স্ট্যান্ডার্ড সোলার মডেল’। এ মডেল অনুসারে সূর্যের আকার, এর ভেতরে চলমান নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার স্বরূপ, এ থেকে নির্গত শক্তির পরিমাণ ইত্যাদি তথ্য কাজে লাগিয়ে নির্ধারণ করা যায় উৎপন্ন নিউট্রিনোদের সংখ্যা। হিসাব করে বের করা নিউট্রিনোদের সব কিন্তু পৃথিবীতে আসে না। অধিকাংশই হারিয়ে যায় মহাশূন্যে। কতগুলো নিউট্রিনো পৃথিবীতে আসতে পারে, সেটিও তাত্ত্বিকভাবেই হিসাব করে বের করতে পারেন পদার্থবিদরা। এরপর শুরু হয় ফলাফল যাচাই করার পালা। সেজন্য ডিজাইন করা হয় বিশেষ ধরনের সংবেদনশীল এক্সপেরিমেন্ট। কাজটি মোটেও সহজ ছিল না। কারণ আর কিছু নয়, নিউট্রিনোদের চরম নিষ্ক্রিয়তা। অবশেষে প্রথম সফলতা আসে মার্কিন  পদার্থবিদ রে ডেভিসের হোমস্টেক এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে, ১৯৬৫ সালে। এক্সপেরিমেন্টটি করা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ডাকোটায় অবস্থিত হোমস্টেক খনিতে। সেখানে মাটির প্রায় এক মাইল গভীরে স্থাপন করা হয়েছিল বিশাল আকৃতির ট্যাংক। তাতে রাখা হয়েছিল প্রায় এক লাখ গ্যালন টেট্রাক্লোরোইথিলিন। এগুলোই ছিল নিউট্রিনো গণনা করার মূল হাতিয়ার। মাটির গভীরে থাকায় এরা অন্য প্রায় সব ধরনের বিকিরণের প্রভাব থেকে মুক্ত ছিল।

সূর্য থেকে আসা নিউট্রিনোদের খুব সামান্য অংশ টেট্রাক্লোরোইথিলিনের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায় অংশ নেয়। ফলে এগুলোতে থাকা ক্লোরিন পরমাণুরা পরিণত হয় তেজস্ক্রিয় আর্গনে। স্বাভাবিক ক্লোরিনে প্রোটনের সংখ্যা ১৭টি। অন্যদিকে আর্গনে প্রোটনের সংখ্যা ১৮টি। অর্থাৎ, নিউট্রিনোদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার ফলে ক্লোরিনে থাকা একটি নিউট্রন রূপান্তরিত হয় প্রোটনে। এভাবেই পাওয়া যায় তেজস্ক্রিয় আর্গন পরমাণু। কিছুদিন পর এই আর্গনগুলো ক্ষয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আবারও ক্লোরিনে রূপান্তরিত হয়। ডিটেক্টরের মাধ্যমে এই তেজস্ক্রিয় আর্গনদের শনাক্ত করার মাধ্যমেই নিউট্রিনোদের প্রকৃত সংখ্যা জানা সম্ভব হয়। অবশ্য তেজস্ক্রিয় আর্গনদের দেখা পাওয়া ছিল খুব কঠিন। এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে একটি করে আর্গন খুঁজে পাওয়া যেত।

বেশ কয়েক বছর ধরে এক্সপেরিমেন্টটি চালানো হয়। পরীক্ষার প্রথম ফলাফল ঘোষণা করা হয় সত্তরের দশকের শুরুতে। এতে বেশ চমক অপেক্ষা করছিল কণাপদার্থবিদদের জন্য। সূর্য থেকে যে পরিমাণ নিউট্রিনো পৃথিবীতে আসার কথা, বাস্তবে খুঁজে পাওয়া যায় তার চেয়ে অনেক কম। মাত্র তিন ভাগের এক ভাগ।

নিউট্রিনোদের রূপ বদল

সবকিছু আবার গোড়া থেকে শুরু করা হলো। তাত্ত্বিক পদার্থবিদরা আবার হিসাব কষে বের করলেন সূর্য থেকে পৃথিবীতে আসা নিউট্রিনোদের সংখ্যা। কোনো ভুল পাওয়া গেল না। অন্যদিকে সব ধাপের কাজের নির্ভুলতা নিশ্চিত করে এক্সপেরিমেন্টের পুনরাবৃত্তি করা হলো। কিন্তু তাতেও পাওয়া গেল হুবহু একই ফল। সূর্য থেকে আসার পথে যেন নিউট্রিনোরা বেমালুম গায়েব হয়ে যাচ্ছে!

হারানো নিউট্রিনোদের খোঁজে এবার বিজ্ঞানীরা সম্পূর্ণ ‘আউট অফ দ্য বক্স’ চিন্তা-ভাবনা শুরু করলেন। আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব সব আইডিয়া নিয়ে কাজ শুরু হলো। তেমনি একটি আইডিয়ার নাম নিউট্রিনোদের স্পন্দন (Neutrino Oscillation)। এ ধারণার সূত্রপাত ঘটে ইতালিয়ান পদার্থবিদ ব্রুনো পন্টিকর্ভের হাত ধরে। স্ট্যান্ডার্ড মডেল থেকে আমরা জানি, নিউট্রিনোরা তিন ধরনের হতে পারে। ইলেকট্রন নিউট্রিনো, মিউওন নিউট্রিনো এবং টাউ নিউট্রিনো। নিউট্রিনো স্পন্দন তত্ত্ব অনুসারে, একধরনের নিউট্রিনো স্বতঃস্ফূর্তভাবে অন্য ধরনের নিউট্রিনোতে রূপান্তরিত হতে পারে। অর্থাৎ, ইলেকট্রন নিউট্রিনোরা রূপান্তরিত হতে পারে মিউওন বা টাউ নিউট্রিনোতে। আবার, ক্রমান্বয়ে ঘটতে পারে উল্টোটাও।

সহজে বোঝার জন্য একটি বাস্তব উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুন, বাসার ফ্রিজে দশ বোতল কোক রেখে দেওয়া হলো। পরের দিন ফ্রিজ খুলে দেখা গেল, কোকের সংখ্যা কমে হয়ে গিয়েছে নয়টি। আর ভেলকিবাজির মতো উদয় হয়েছে একটি পেপসির বোতল। বোতলগুলোকে কোনো ধরনের স্পর্শ না করে ফ্রিজটা বন্ধ করে রাখা হলো। কয়েকদিন পর সেটি আবার খুলে দেখা গেল, কোকের বোতলের সংখ্যা আরও কমে গেছে। নেমে এসেছে অর্ধেকে। অন্যদিকে পেপসির বোতলের সংখ্যা বেড়েছে সমান সংখ্যক। আরও কয়েকদিন পর ফ্রিজ খুললে দেখা যাবে, কোকের বোতলের কোনো অস্তিত্বই নেই। দশটি বোতলই পেপসিতে পরিপূর্ণ। এই ঘটনার পর থেকে ক্রমান্বয়ে ঘটবে উল্টো ঘটনা। পেপসি কমে গিয়ে বাড়বে কোকের সংখ্যা। ব্রুনোর তত্ত্ব অনুসারে, ঠিক এমন করেই নিউট্রিনোদের রূপ বদলের খেলা চলতে থাকে। পুরো বিষয়টাই এক ধরনের কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল ইফেক্ট।

ব্রুনোর তত্ত্ব যদি সঠিক হয়,তাহলে এক্সপেরিমেন্টে নিউট্রিনোদের সংখ্যা কম পাওয়ার একটি যৌক্তিক ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায়। সূর্যের বুকে সংঘটিত হওয়া বিভিন্ন ধরনের নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া থেকে কেবল উৎপন্ন হয় ইলেকট্রন নিউট্রিনোরা। কারণ, অন্য ধরনের নিউট্রিনো উৎপন্ন হতে যে পরিমাণ শক্তি প্রয়োজন পড়ে, তা সূর্যের কেন্দ্রে থাকে না। উৎপন্ন হওয়ার পর সেগুলো পৃথিবীতে আসার পথে যদি মিউওন নিউট্রিনো বা টাউ নিউট্রিনোতে রূপান্তরিত হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে শনাক্তকৃত মোট নিউট্রিনোর সংখ্যা কম হবে। কারণ হোমস্টেক এক্সপেরিমেন্ট বা একই মূল নীতি অনুসরণ করে ডিজাইন করা অন্য এক্সপেরিমেন্টগুলো ইলেকট্রন নিউট্রিনো ছাড়া অন্যদের শনাক্ত করতে পারে না। আমরা যদি ইলেকট্রন নিউট্রিনোদের সঙ্গে একই দিক থেকে আসা অন্য নিউট্রিনোদেরকেও শনাক্ত করার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করতে পারি, তাহলে খোঁজ মেলার কথা হারানো নিউট্রিনোদের। সেই সঙ্গে নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হবে নিউট্রিনোদের স্পন্দন তত্ত্ব। পরবর্তীতে ঠিক এ কাজটাই করা সম্ভব হয় সাডবারি নিউট্রিনো অবজারভেটরিতে।

সাডবারি নিউট্রিনো অবজারভেটরি, কানাডা

সাডবারি নিউট্রিনো অবজারভেটরি স্থাপন করা হয় কানাডাতে। মাটির নিচে প্রায় দুই কিলোমিটার গভীরে। এতে নিউট্রিনো টার্গেট হিসেবে ব্যবহার করা হয় ভারী পানি। এদের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ হাজার টন। ডিটেক্টর হিসেবে অবজারভেটরিতে ব্যবহার করা হয় ৯ হাজারেরও বেশি ফটোমাল্টিপ্লায়ার টিউব। নিউট্রিনোরা যখন কালেভদ্রে ভারী পানির সঙ্গে বিক্রিয়া করে, তখনই উৎপন্ন হয় চেরেনকভ রেডিয়েশন। ভিন্ন ধরনের নিউট্রিনোর মিথস্ক্রিয়ার জন্য আলাদা সংখ্যক ফোটন উৎপন্ন হয়। আবার ফোটনদের উৎপন্ন হওয়ার প্যাটার্নও হয় আলাদা। ফলে ফটোমাল্টিপ্লায়ার টিউবের মাধ্যমে সহজেই শনাক্ত করা যায় সব ধরনের নিউট্রিনোদের। আর এভাবেই খোঁজ মেলে সূর্য থেকে আসার পথে হারিয়ে যাওয়া নিউট্রিনোদের। সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় নিউট্রিনোদের স্পন্দন। এই এক্সপেরিমেন্ট থেকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিশ্চিত করতে সক্ষম হন বিজ্ঞানীরা। নিউট্রিনোদের ভর কোনোভাবেই শূন্য হতে পারে না। কারণ, একধরনের নিউট্রিনোরা অন্য ধরনের নিউট্রিনোতে রূপান্তরিত হতে হলে অবশ্যই খুব সামান্য হলেও ভরের অস্তিত্ব থাকতে হবে। তবে নিউট্রিনোদের ভরের সঠিক মান বিজ্ঞানীরা এখনও নিশ্চিতভাবে বের করতে পারেননি।


5.       

6.      মহাবিশ্বে নিউট্রিনো নামের একটি অদ্ভুতুড়ে ও অসামাজিক কণা আছে। কয়েক আলোকবর্ষজুড়ে পুরু সিসার পাত ভেদ করেও এই কণাটি চলে যেতে পারে। কারণ, এই কণা সহজে অন্য কারও সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে না।



1.      

2.     মহাকর্ষের এই রহস্য বোঝা সম্ভব হলে মহাবিশ্ব ও চারপাশের জগৎকে বোঝার ক্ষেত্রে অনেক বড় প্রভাব পড়বে। মনে রাখতে হবে, মহাকর্ষ বিশাল বিপুল দূরত্বে কাজ করতে পারে। এটিই একমাত্র ও প্রধানতম বল, যা মহাবিশ্বের আকৃতি এবং তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।

3.     মহাকর্ষ যে স্থান-কালকে বাঁকিয়ে দেয়, সেটিও কিছু চমৎকার সম্ভাবনার ইঙ্গিত করে। এই মুহূর্তে আমাদের পক্ষে এই সৌরজগতের বাইরে অন্য কোনো নক্ষত্র ব্যবস্থায় যাওয়া সম্ভব নয়। কারণ, আমাদের পাশ্ব৴বর্তী নক্ষত্রের দূরত্বও অনেক বেশি। কিন্তু মহাকর্ষের রহস্য ভেদ করা সম্ভব হলে হয়তো স্থানকে কীভাবে বাঁকাতে হয় কিংবা ওয়ার্মহোল কীভাবে তৈরি করতে হয় বা নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, তা বুঝে ফেলতে পারব। সেটি সম্ভব হলে মহাবিশ্বের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়ানোর আমাদের এত দিনের যে অদম্য ইচ্ছা, তা একদিন সত্যি হতে পারে। তখন স্থান-কালের চাদর ভাঁজ করে মহাবিশ্বের যেকোনো প্রান্তে চলে যাওয়া যাবে চোখের পলকে। সেটি সত্যে পরিণত করার মূল চাবিকাঠি হলো মহাকর্ষ। কাজেই রহস্যময় হলেও মহাকর্ষ বল শুধু আমাদের মাটিতে আটকে রাখে, সে কথা কে বলল! বড় প্রেম যেমন শুধু কাছে টানে না, দূরেও ঠেলে, বিপুল পরিসরের মহাকর্ষ বলও তাই। এই বলের কাঁধে চেপে হয়তো আমরা আকাশ-বাতাস, গ্রহ-তারকা ভেদ করে একদিন দূরে, বহুদূরে চলে যেতে পারব। আর সেই সম্ভাবনা নির্ভর করছে ভবিষ্যতের কোনো বিজ্ঞানীর হাতে মহাকর্ষের রহস্য সমাধানের ওপর। কে জানে, এই লেখার পাঠকদের মধ্যেই হয়তো লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের সেই বিজ্ঞানী।

4.    

 

5.      

6.       

7.   বিজ্ঞানীরা যে প্রক্রিয়ায় অসীম এড়িয়ে যান

8.    

9.     যেমন একটি ইলেকট্রন আরেকটি ইলেকট্রনকে ধাক্কা দেওয়ার কারণে দ্বিতীয় ইলেকট্রনটির যে চলাচল হয়, তার জন্য কোনো বল বা অদৃশ্য কোনো প্রভাব ব্যবহার করা হয় না। বরং পদার্থবিদেরা মনে করেন, এই মিথস্ক্রিয়ার কারণ একটি ইলেকট্রন আরেকটি ইলেকট্রনের দিকে একটি কণা ছুড়ে দেয়, যার মাধ্যমে তার কিছু ভরবেগ স্থানান্তরিত হয়। ইলেকট্রনের ক্ষেত্রে বলবাহী এই কণাকে বলা হয় ফোটন। অন্যদিকে দুর্বল বলের বলবাহী কণার নাম ডব্লিউ ও জেড বোসন। এই বলবাহী কণা বিনিময়ের মাধ্যমে দুর্বল বল কাজ করে। আর শক্তিশালী বল বিনিময় হয় গ্লুয়ন কণার মাধ্যমে।

10.                      

11.   

12.বিজ্ঞানীরা প্রতিটি কারণের কারণ খুঁজে থাকেন এবং অনেক ক্ষেত্রে পেয়েও যান গণিতের সূক্ষ্ণ প্রয়োগ-পদ্ধতির মাধ্যমে। কিন্তু কারণের কারণ মহাকারণের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা নীরব ভূমিকা পালন করে থাকেন সাধারণতঃ।যদি প্রশ্ন করা হয়ঃ আকাশ-মহাকাশ কত বড়? বৈজ্ঞানিক জবাব পাওয়া যাবে জানা অআকাশের চেয়ে অজানা মহাকাশ অনেক বড়। কত বড়? এ প্রশ্নের ব্যাপারে তাৎক্ষণিক বৈজ্ঞানিক ভাষ্য পাওয়া যাবে না। বিজ্ঞানীদেরও অপকট ভাষ্য, এমন প্রশ্ন রয়েছে যা এ জগতে পাওয়া যাবে না। যেমন বিগ ব্যাং হাইয়েস্ট এনার্জেটিক রেডিয়েশনের বিস্ফোরণে সংঘটিত। কিন্তু হাইয়েস্ট এনার্জেটিক রেডিয়েশনের পূর্বে কি ছিল?এ প্রশ্ন এবং তার উত্তর আপাততঃ বিজ্ঞানে নেই।

13.   

14.   

15.                       কণাপদার্থ বিজ্ঞানের স্ট্যান্ডার্ড মডেল।

16.   

17.এই মডেল প্রাকৃতিক জগতের অধিকাংশকে ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে অবিশ্বাস্য রকম সফল। কোয়ান্টাম কণার দৃষ্টিভঙ্গিতে জগতের অনেক কিছু ব্যাখ্যা করা যায়। এমনকি আমরা আগে দেখিনি এমন অনেক কিছুর ভবিষ্যদ্বাণীও করা যায়। যেমন এই মডেল ব্যবহার করেই হিগস বোসন কণার ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল।

18. 

19.লার্জ হ্যাড্রন কলাইডারে ২০১২ সালে কণাটি শনাক্ত করাও সম্ভব হয়েছে। আবার দুর্বল বল কেন ক্ষুদ্র পরিসরে কাজ করে, তার ব্যাখ্যাও পাওয়া যায় এ মডেল থেকে। আসলে এ বলবাহী কণার ভর অনেক বেশি। সে কারণে কণাটির চলাচল সীমাবদ্ধ। এত সফলতা সত্ত্বেও স্ট্যান্ডার্ড মডেলের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, একই উপায়ে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। কিন্তু কেন?

20. 

21.            কোয়ান্টাম মেকানিকসের মাধ্যমে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা না করতে পারার দুটো কারণ

22. 

23.কোয়ান্টাম মেকানিকসের মাধ্যমে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা না করতে পারার দুটো কারণ রয়েছে। প্রথমত স্ট্যান্ডার্ড মডেলে মহাকর্ষকে খাপ খাওয়াতে গেলে মহাকর্ষও কোনো কণার মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয় বলে কল্পনা করে নিতে হয়। পদার্থবিদেরা এই হাইপোথেটিক্যাল কণার একটি গালভরা নামও দিয়েছেন‘গ্র্যাভিটন’। বাংলায় বলা যায় মহাকর্ষ কণা। এ কণার অস্তিত্ব যদি সত্যিই থাকে, তাহলে আপনি শুয়ে, বসে বা দাঁড়িয়ে যেখানেই থাকুন না কেন, আপনার দেহ থেকে অনবরত অতিক্ষুদ্র বলের মতো গ্র্যাভিটন কণা ছুটে যাচ্ছে ভূপৃষ্ঠের দিকে। আবার ভূপৃষ্ঠ থেকেও একই রকম কোয়ান্টাম কণা ছুটে আসছে আপনার দিকে। এই দুই মহাকর্ষ কণা বিনিময়ের কারণে আপনি পৃথিবীর বুকে আটকে থাকতে পারছেন।

24. 

25.  কিন্তু এ ধারণার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো গ্র্যাভিটনের অস্তিত্ব পুরোটাই কাল্পনিক। বাস্তবে এ রকম কোনো কণার খোঁজ আজও পাওয়া যায়নি।

26.                

27.           অন্য বলগুলোর সঙ্গে মহাকর্ষের আপাত–অসংগতির অর্থ হতে পারে

28. 

29. অন্য বলগুলোর সঙ্গে মহাকর্ষের এই আপাত–অসংগতির অর্থ হতে পারে, আমরা যে প্যাটার্ন আবিষ্কার করেছি, সেটি সঠিক নয়, অথবা বড় কোনো কিছু আমরা এখনো বুঝতে পারছি না। কোনটা ঠিক? তা–ও অমীমাংসিত।

30. 

31.দ্বিতীয় কারণটি হলো, মহাকর্ষকে ব্যাখ্যার জন্য আমাদের কাছে চমৎকার ও কার্যকর একটি তত্ত্ব আছে। সাধারণ আপেক্ষিকতা। ১৯১৫ সালে তত্ত্বটি প্রণয়ন করেন আইনস্টাইন। তারপর থেকে নানাভাবে নিজের সফলতার পরিচয় দিয়েছে আপেক্ষিকতা তত্ত্ব। এ তত্ত্বে মহাকর্ষকে দুটি বস্তুর মধ্যে কোনো বলের টান হিসেবে ভাবা হয় না, বরং ভাবা হয় স্থানের বিকৃতির ফল হিসেবে। এর মানে কী? আইনস্টাইন স্থানকে পরম না ধরে গতিশীল প্রবাহ বা নমনীয় চাদরের মতো করে কল্পনা করলেন। এভাবে মহাকর্ষকে সরলভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। এ তত্ত্ব বলে, কোনো বস্তু বা শক্তির উপস্থিতিতে তার চারপাশের নমনীয় চাদরের মতো স্থান বেঁকে যায়। এতে বস্তুটির কাছের বস্তুগুলোর গতিপথ বদলে যায়। আইনস্টাইনের চিত্রমতে, মহাকর্ষ বল বলে কিছু নেই, আসলে পুরোটাই স্থানের বিকৃতি বা বক্রতার ফল।

32. 

33.আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা অনুযায়ী,  মহাকর্ষীয় ভর কোনো চার্জ নয়, বরং কোন বস্তু তার চারপাশের স্থানকে কতটুকু বক্র করতে পারে তার পরিমাণ। তত্ত্বটাকে যতই উদ্ভট বলে মনে হোক না কেন, এটা ১) স্থানীয় মহাকর্ষ, ২)মহাজাগতিক মহাকর্ষ এবং মহাবিশ্বের অনেক অদ্ভুত পরিঘটনা সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে। এ তত্ত্ব ব্যাখ্যা করে, আলো কেন বস্তুর চারপাশে বেঁকে যায় এবং আপনার জিপিএস কেন কাজ করে। এমনকি কৃষ্ণগহ্বরের ভবিষ্যদ্বাণী করে তত্ত্বটি।

34. 

35.         মহাকর্ষীয় সমস্যার পর সমস্যা

36.   

37.সমস্যা হলো সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব বেশ ভালোভাবে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা করতে পারে। তাই আমাদের ধারণা হয়েছে, এটাই সম্ভবত প্রকৃতির সঠিক ব্যাখ্যা। ঝামেলা হলো এ তত্ত্বটাকে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার মতো অন্য কোনো মৌলিক তত্ত্বের সঙ্গে একত্র করা সম্ভব হয়নি। অথচ কোয়ান্টাম মেকানিকসও প্রকৃতির সঠিক ও নির্ভুল ব্যাখ্যা করতে পারে বলে আমরা মনে করি।

  

40.                     সমস্যাটার কারণাদি42.সমস্যাটার কারণ কোয়ান্টাম মেকানিকস অনুযায়ী, মহাবিশ্বের চিত্র একটু আলাদা। এ তত্ত্বে স্থানকে সমতল পটভূমি হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু সাধারণ আপেক্ষিকতা অনুসারে, স্থান গতিশীল ও নমনীয়, যা সময়ের সঙ্গে মিলে স্থান-কাল গঠন করে। কাজেই বস্তুর ভর বা শক্তি স্থান-কালকে বাঁকিয়ে দিতে পারে। তাহলে প্রশ্ন আসে, কোন চিত্রটা সঠিক?

মহাকর্ষ কি স্থানের বক্রতা নাকি কণার মধে৵ অজানা উড়ন্ত কোয়ান্টাম বল?

43.মহাকর্ষ কি স্থানের বক্রতা নাকি কণার মধে৵ অজানা উড়ন্ত কোয়ান্টাম বল? মহাবিশ্বের সবকিছুই আসলে কোয়ান্টাম মেকানিকসের নিয়ম মেনে চলে। তাই মহাকর্ষও যদি সেই নিয়ম মেনে চলে, তাহলে বিষয়টা আমাদের জন্য বোধগম্য হয়ে উঠত। কিন্তু গ্র্যাভিটন বা মহাকর্ষ কণা এখন পর্যন্ত কাগজে–কলমেই সীমাবদ্ধ। গ্র্যাভিটন নামের কোনো কোয়ান্টাম কণার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।

গ্র্যাভিটন খোঁজার যন্ত্র

7.      

8.     গণনায় দেখা গেছে, বৃহস্পতি গ্রহ আকৃতির কোনো ডিটেক্টর দিয়ে গ্র্যাভিটন কণা খোঁজা হলে তীব্র গ্র্যাভিটন উৎসের কাছেও প্রতি ১০ বছরে মাত্র একটি কণা পাওয়া যেতে পারে।

9.       

10.প্রশ্ন হলো একটি গ্র্যাভিটন কণা যদি আলাদা করে দেখা অসম্ভব হয়, তাহলে মহাকর্ষ আসলে কোয়ান্টাম পরিঘটনা কি না, তা বোঝা সম্ভব হবে কীভাবে? সে ক্ষেত্রে আরেকটি উপায় আছে। এমন কোনো ভৌত পরিস্থিতি অনুসন্ধান করা দেখা, যেখানে দুটি তত্ত্বের ভবিষ্যদ্বাণী মিলবে না। সেটি হতে পারে কৃষ্ণগহ্বরের ভেতরে অনুসন্ধান চালানো। অবশ্য সেটি খুব একটি বাস্তবসম্মত প্রস্তাব নয়।

11.আপেক্ষিক তত্ত্বমতে, কৃষ্ণগহ্বরের কেন্দ্রে রয়েছে সিঙ্গুলারিটি বা পরম বিন্দু। এই বিন্দুতে পদার্থের ঘনত্ব এতই বেশি যে সেখানে মহাকর্ষ ক্ষেত্র অসীম। আক্ষরিক অর্থেই ব্যাপারটা মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো। কারণ, এখানে স্থান-কাল এমনভাবে বিকৃত হয়ে যায় যে তা বোধগম্য হয় না। এ রকম পরম বিন্দুর অস্তিত্বের ব্যাপারে সাধারণ আপেক্ষিকতায় কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু কোয়ান্টাম মেকানিকসের বিরোধী। কোয়ান্টাম মেকানিকসের নীতি অনুসারে, কোনো একক বিন্দুতে (পরম বিন্দুর মতো) যেকোনো কিছুকে আলাদা করা অসম্ভব। কারণ, সেখানে সব সময় কিছু না কিছু অনিশ্চয়তা থেকে যায়। কাজেই এই পরিস্থিতিতে দুটি তত্ত্বের একটি অকার্যকর হয়ে যায়। যদি জানা যেত কৃষ্ণগহ্বরের ভেতরে আসলে কী ঘটে, তাহলে কোয়ান্টাম মেকানিকস এবং মহাকর্ষকে একত্রে জোট বাঁধার জন্য কিছু ক্লু হয়তো পাওয়া যেত। দুর্ভাগ্য হলেও সত্যি, সরেজমিনে কৃষ্ণগহ্বর পরিদর্শন করা কিংবা সেখানে গিয়ে সশরীর টিকে থাকা, পরীক্ষাটা সম্পন্ন করা, তারপর ফলাফলটা ঝুলিতে ভরে কৃষ্ণগহ্বরের অতি শক্তিশালী মহাকর্ষকে পাশ কাটিয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসা এখন পর্যন্ত অসম্ভব।

মহাকর্ষকে টানের পরিবর্তে চাপ ধরা হলে

12.সির্ণ মনে করে, ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্তে প্রবল স্রোতের ন্যায় মহাকর্ষ ঢুকে পড়ে যেমন প্রবল বন্যার সময় চতুর্দিক হতে পানি নালা-নর্দমায় ঢুকে পড়ে প্রবলভাবে যাতে সৃষ্টি হয় ঘূর্ণাবর্ত। মহাকর্ষ ব্ল্যাকহোলে অনুরূপ ঢুকে সামনে প্রবল স্রোত আকারে আলোকে সাথে নিয়ে বয়ে যায় । এতে আলোর প্রতি এক ধরণের মহাকর্ষীয় চাপ সৃষ্টি হয়। এই চাপের দরুন সম্ভবতঃ আলো ফিরে আসতে পারে না।

13. 

14.                     গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ বা মহাকর্ষ তরঙ্গ

15.   

16.মৃত্যুচুম্বনের জন্য পরস্পরের দিকে সর্পিল গতিতে ধেয়ে আসা কৃষ্ণগহ্বরের সংঘর্ষ থেকে জন্ম হয় মহাকর্ষ তরঙ্গের। গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ বা মহাকর্ষ তরঙ্গ হলো ত্বরণপ্রাপ্ত ভরের কারণে সৃষ্ট স্থানের ভেতর মৃদু ঢেউ। গোসলের সময় বাথটাবে বা কোনো শান্ত পুকুরের পানিতে হাত রাখলে, চারদিকে যেমন ছোট ছোট ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে, স্থানের ভেতর দিয়ে মহাকর্ষ তরঙ্গও অনেকটা সেভাবে ছড়িয়ে পড়ে। অতিভারী বস্তুগুলো স্থানের ভেতর চলাচল করলেও ঠিক একই ঘটনা ঘটে। এই চলমান ভর খোদ স্থানকেও বাঁকিয়ে দিতে পারে। তা এমন এক উত্তেজনা বা বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে, যা তরঙ্গের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

17.   

মজার ব্যাপার হলো মহাকর্ষ তরঙ্গ তার চলার পথে সামনে যা পায়, তাকেই সংকুচিত ও প্রসারিত করতে করতে এগিয়ে যায়। তাই মহাকর্ষ তরঙ্গের সামনে একটি বৃত্ত পরিণত হয় উপবৃত্তে, বর্গ পরিণত হয় আয়তক্ষেত্রে। কথাটা শুনতে মজার মনে হচ্ছে তাই না? এই বইটা পড়ার সময় কোনো মহাকর্ষ তরঙ্গ যদি আপনার দেহ ও বইটাকে ভেদ করে চলে যায়, তাহলে দুটির আকৃতিই বিকৃত হয়ে যাবে। কিন্তু আপনি তা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারবেন না। একেবারে ভুতুড়ে ব্যাপার! আসলে মহাকর্ষ তরঙ্গস্থানকে বিকৃত করে ১০-২০ গুণ। এর মানে হলো আপনার কাছে যদি ১০২০ মিলিমিটার লম্বা একটি লাঠি থাকে, আর তার ভেতর দিয়ে মহাকর্ষ তরঙ্গ চলে যায়, তাহলে লাঠিটা ছোট হবে মাত্র এক মিলিমিটার। এই সংকোচন এতই ছোট যে তা শনাক্ত করা বেশ কঠিন।

মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করার উপায়

1.     বিজ্ঞানীরা  মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করার উপায়ও বের করেছেন। এমনই পরীক্ষা চালানো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের লাইগোতে। লাইগোর পূর্ণ রূপ লেজার ইন্টারফেরোমিটার গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ অবজারভেটরি। সেখানে চার কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের দুটি টানেল পরস্পরের সমকোণে স্থাপন করা হয়েছে। টানেলের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত দূরত্বের পরিবর্তন মাপার জন্য আছে একটি লেজার। মহাকর্ষ তরঙ্গ এর ভেতর দিয়ে চলে গেলে সেখানকার স্থান একদিকে প্রসারিত হয়, আবার অন্যদিকে সংকুচিত হয়। তার প্রভাব টানেলের লেজার রশ্মিতেও পড়বে। লেজার রশ্মির ব্যতিচার পরিমাপ করে পদার্থবিদেরা নিশ্চিত হন, কোনো মহাকর্ষ তরঙ্গ সেখানকার স্থানকে সংকুচিত ও প্রসারিত করেছে কি না।

2.     যুক্তরাষ্ট্রের দুটি জায়গায় প্রায় ৬২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচে এ রকম দুটি টানেল স্থাপন করা হয়। ২০১৬ সালে সেখানে প্রথমবার মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করেন বিজ্ঞানীরা।

3.      

4.     উল্লেখ্য, প্রায় ১০০ বছর আগে এমন তরঙ্গের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন আইনস্টাইন। তবে এখান থেকে মহাকর্ষ কীভাবে কাজ করে, সে ব্যাপারে কোনো কোয়ান্টাম চিত্র পাওয়া যায় না। কারণ, মহাকর্ষ তরঙ্গ আর মহাকর্ষ কণা বা গ্র্যাভিটন এক জিনিস নয়।

5.      

তাহলে রহস্যময় মহাকর্ষের সঠিক ব্যাখ্যা কী? এই বলটা দুর্বল কেন? কেন সেটি অন্য বলগুলোর মতো নয়? এর কারণ এমনও হতে পারে, মহাকর্ষ হয়তো বিশেষ কোনো বল। মহাকর্ষকে অন্য বলের মতো হতে হবে কিংবা একটিমাত্র তত্ত্ব দিয়েই সবকিছু ব্যাখ্যা করতে হবে, এমনটা না–ও হতে পারে।

বড় দৃষ্টিভঙ্গির দিকে আমাদের মন খোলা রাখতে হবে। কারণ, মহাবিশ্বের মৌলিক কিছু সত্য সম্পর্কে আমরা এখনো অন্ধকারে রয়ে গেছি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা এমন কিছু অনুমান করেছি, যা পরবর্তী সময়ে ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে। কিংবা নিদি৴ষ্ট বা বিশেষ কিছু শর্ত সাপেক্ষে তা সত্য।

এমনও হতে পারে, আমাদের আগের জানা যেকোনো কিছুর চেয়ে মহাকর্ষ ভিন্ন কিছু। যার কথা আমরা আগে কখনো ভাবতে পারিনি। কিংবা কে জানে উল্টোটাও হয়তো সত্যি। মনে রাখতে হবে, আমাদের লক্ষ্য হলো মহাবিশ্বকে সঠিকভাবে বুঝতে পারা। তাই এটা আসলে কেমন, সে সম্পর্কে অনেক বেশি অনুমান করা বাদ দিতে হবে।। কারণ, আইজাক নিউটন বলে গেছেন, সত্য কঠিন পথে নয়, সহজ-সরল পথে নিহিত। 

6.     কখনো যদি দেখা যায়, মহাকর্ষ বিশেষ কিছু এবং অন্যান্য মৌলিক বলের চেয়ে এটা একেবারেই আলাদা, সেটিই জোগান দিতে পারে মহাবিশ্বের বৃহৎ চিত্র সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ক্লু। এর মানে হয়তো মহাকর্ষ গভীর কিছু, যা মহাবিশ্বের নকশার মধ্যে গেঁথে আছে। মাঝেমধ্যে আমরা নিয়ম ছাড়াও ব্যতিক্রম থেকেও অনেক বেশি শিখতে পারি। এসব রহস্য ব্যাখ্যায় আমাদের কাছে বর্তমানে আইডিয়ারও কমতি নেই।

উল্লেখ্য, মানব জ্ঞানে কুলায় না-এমন বিষয়ে সঠিক ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়ার জন্য এক নতুন বিজ্ঞানের চিন্তা-ভাবনা শুরু হয়েছিল গত বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে। নতুন প্রস্তাবিত বিজ্ঞানের নামকরণও করা হয়েছিল “Frontier Science”. বিজ্ঞানীদের প্রত্যাশা, নতুন প্রস্তাবিত বিজ্ঞানে এতকাল যাবৎ পৃথিবীসহ মহাজগতে সংঘটিত কিছু রহস্যময় বিষয় এবং বস্তুকে নিছক গৎবাধা শব্দ বা প্রবাদে যেমনঃ অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, ভূতুড়ে, অদ্ভূতুড়ে, হ্যালুয়েশন, টেলিপ্যাথি ইত্যাদি বলে কোনো প্রকার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ছাড়াই উড়িয়ে দেয়া হচ্ছিল তা বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় খতিয়ে দেখে সত্য উদ্ধার করা-যে সত্যের অঙ্গিকার নিয়ে বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছিল সুদূর অতীতে।

7.     যাহোক, মহাকর্ষের দুর্বলতা ব্যাখ্যার জন্য মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো একটি আইডিয়া হলো অতিরিক্ত মাত্রার ধারণা। এ ধারণামতে, আমরা চার মাত্রা নয়, তার চেয়ে বেশি মাত্রার বিশ্বে বাস করি। কিছু পদার্থবিদ বলেন, মহাকর্ষ অন্য মাত্রাগুলোতে চলে যাওয়ার কারণে দুর্বল হয়ে গেছে। অতিরিক্ত মাত্রাগুলোকে আমলে নিলে মহাকর্ষ আসলে অন্য বলগুলোর মতোই শক্তিশালী। কিন্তু সেটিও ঠিক নয়, বেঠিক তা প্রমাণ করার উপায়ও এখনো আমাদের জানা নেই। তাই মহাকর্ষ এখনো আমাদের কাছে বড় একটি রহস্য।


গ্যালিলির হাত ধরে আধুনিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের জন্ম। জন্ম আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানেরও। গ্যালিলিও প্রকৃতির সামান্য কিছু রহস্য উন্মোচন করেছিলেন। পদার্থবিজ্ঞান গবেষণায় সত্যিকারের গতি আসে সর্বকালের অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটনের হাত ধরে। তাঁর গতিসূত্র আর মহাকর্ষ সূত্রের আবিষ্কারই পদার্থবিজ্ঞানের বৈপ্লবিক সূচনা।

নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রের মূল সুর ছিল, মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুই পরস্পরকে আকর্ষণ করছে। এই আকর্ষণ বলের মান বস্তু দুটোর ভরের গুণফলের সমানুপাতিক। এবং দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপতিক। এই আকর্ষণ বলকে মহাকর্ষ বল বলে।

দুটি বস্তুর ভর যত বাড়ে, তত তাদের ভরের গুণফলের মানও বাড়ে। সুতরাং বস্তু দুটোর ভর যত বেশি হবে, তাদের মধ্যে ক্রিয়াশীল আকর্ষণ বলের মানও তত বাড়বে। আবার বস্তু দুটোর দূরত্ব যদি বাড়ে তবে তাদের মধ্যে আকর্ষণ বলের মান কমবে। এই কমার হার বর্গাকারে। অর্থাৎ দূরত্ব যদি বেড়ে দ্বিগুণ হয় তবে মহাকর্ষ বলের মান কমে আগের মানের এক চতুর্থাংশে নেমে আসবে।

নিউটনের আপেল পড়ার গালগল্পের একটা ইতিবাচক দিক আছে। তাই সেটা নিয়ে আলাপ করা যেতেই পারে। ভাবুন, নিউটনের জায়গায় আপনি একটা আমগাছের নিচে বসে আছেন। ধপাস করে একটা আম আপনার সামনে পড়ল। তাহলে কী ভাবতেন আপনি? আমটা নিচেই বা পড়ল কেন? ওপরেও তো উঠে যেতে পারত। সেটা হয়নি। কারণ ওই মহাকর্ষ বল।

https://bn.quora.com/ মহাকর্ষ-বল-সংরক্ষণশীল-বল

মহাকর্ষ এবং স্থানকালের বক্রতার মধ‍্যে পার্থক্য কী?

কোনও পার্থক্য নেই। স্থানকালের বক্রতাই মহাকর্ষ।

বিরাট আকারের বা অত্যন্ত ঘন কোনও বস্তুর আশেপাশের অঞ্চল ওই বস্তুর উপস্থিতির জন্যই বক্রতা প্রাপ্ত হয়। এই বক্রতা স্থানকালের অন্তর্বর্তী/স্বকীয় বক্রতা (Intrinsic Curvature) যাকে কোনওভাবেই দূর করা যায়না।

বিজ্ঞানী আইনস্টাইন এর ধারণা অনুযায়ী স্পেস বা মহাকাশ একটি টান করা রাবার এর চাদরের মত, এতে নক্ষত্র, গ্রহের মত বড় বড় ভর নিমজ্জিত আছে যা এই স্পেস কে বিকৃত করে, ফলে অপেক্ষাকৃত কম ভর যুক্ত বস্তু গুলি এদের চার পাশে ঘুরতে থাকে এবং ধীরে ধীরে ঘুরে ঘুরে গতি হারিয়ে এদের কেন্দ্রে এসে পড়ে।

যে কোন ভরের দুটো বস্তুর মধ্যে আকর্ষণ কে মহাকার্ষ বলে। যদি দুটোর মধ্যে একটা পৃথিবী হয় সেক্ষেত্রে আকর্ষিত বল অভিকর্ষ বল বলে।https://bn.quora.com/topic/মহাকর্ষ-ও-অভিকর্ষ

মহাবিশ্বে বক্রতা সৃষ্টি হয় স্থানকালে শক্তির উপস্থিতিতে

স্থানকালের এই ধরণের স্বকীয় বক্রতাই হল সত্যিকারের মহাকর্ষ। এই বক্রতা সৃষ্টি হয় স্থানকালে শক্তির উপস্থিতিতে। ভর নিজেও একপ্রকার শক্তি তাই ভরশক্তির কারণে স্থানকালে বক্রতা সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া অন্যান্য শক্তির উপস্থিতিতেও স্থানকালের ওপর একই প্রভাব থাকবে।

গাণিতিকভাবে একে প্রকাশ করে সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের ‘আইনস্টাইন ক্ষেত্র সমীকরণ’ (Einstein Field Equations in General Theory of Relativity)।

নিউটনীয় মহাকর্ষ তত্ত্ব আইনস্টাইনীয় মহাকর্ষ তত্ত্বের একটি approximation। নিউটনের তত্ত্বে অপেক্ষাকৃত দুর্বল মহাকর্ষ ক্ষেত্রের পরিমাপ করা যায় কিন্তু মহাকর্ষ আসলে কীভাবে কাজ করে তা জানা যায় না বা সবধরণের মহাকর্ষীয় ঘটনাবলী ব্যাখ্যা করা যায় না। https://bn.quora.com/ মহাকর্ষ-বল-সংরক্ষণশীল-বল

মহাবিশ্বের যেকোনো দুইটি বস্তুর মধ্যাকার আকর্ষন বলকে বলে মহাকর্ষ। এটি একটি অস্পর্শ বল। অর্থাৎ এই বলে কোনো স্পর্শ হয় না। যেমন চৌম্বক বল। নির্দিষ্ট দুরত্বে আসার পর দুইটি চুম্বক একে অপরকে আকর্ষণ বা বিকর্ষণ করে থাকে। https://bn.quora.com/অভিকর্ষ-এক-ধরনের-মহাকর্ষ-বল


স্ট্যান্ডার্ড মডেল থেকে মহাকর্ষকে বাদ দেওয়া সম্পর্কে আপনার মতামত কী?

বিজ্ঞানীদের মতে, মহাকর্ষকে স্ট্যান্ডার্ড মডেল থেকে বাদ দেওয়ার দুটি কারণ আছেঃ

১) আমরা এখনও পর্যন্ত মহাকর্ষের কোনও কোয়ান্টাম ক্ষেত্রতত্ত্ব তৈরি করতে পারিনি। মহাকর্ষের তত্ত্ব আমাদের হাতে যেটা আছে তা হল আইনস্টাইনের ‘সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব’ যেটা বিজ্ঞানের অন্যতম সুন্দর (গাণিতিক ও যৌক্তিক দিক দিয়ে) ও অসাধারণ সফল একটি তত্ত্ব (অর্থাৎ এক শতাব্দীর অজস্র সঠিকভাবে সম্পাদন করা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষার সাথে এই তত্ত্বের দেওয়া ফলের কখনও কোনও গরমিল হয়নি)। কিন্তু সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব একটি সনাতন ক্ষেত্রতত্ত্ব; এর মধ্যে ক্ষুদ্র জগতের নিয়মাবলী অর্থাৎ কোয়ান্টাম বলবিদ্যার নিয়মগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি (এবং করা যায়নি)। ফলে প্রকৃতির সেইসমস্ত পরিসর যেখানে একটি ক্ষুদ্র অঞ্চল ও তীব্র মহাকর্ষ- উভয়ই উপস্থিত (যেমন একটি কৃষ্ণগহ্বরের কেন্দ্রস্থল বা ব্রহ্মাণ্ডসৃষ্টির আদি মুহূর্ত যখন সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড একটি বিন্দুর আকারের ছিল ইত্যাদি) সেখানে সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব গাণিতিকভাবে অর্থহীন ও ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে।

কণা পদার্থবিদ্যার স্ট্যান্ডার্ড মডেল পুরোপুরি কোয়ান্টাম ক্ষেত্রতত্ত্ব-নির্ভর একটি মডেল ফলে মহাকর্ষ সেখানে অনুপস্থিত”।(সূত্রঃhttps://bn.quora.com/topic/মহাকর্ষ-ও-অভিকর্ষ)

“এখন সারা বিশ্বে বিপুল গবেষণা চলছে মহাকর্ষের কোয়ান্টাম তত্ত্ব আবিষ্কারের জন্য। এই বিষয়ে সবচেয়ে অগ্রণী তত্ত্বটি হল M-তত্ত্ব যা আসলে ৫ টি ভিন্ন সুপারস্ট্রিং তত্ত্বের একীকরণ (তবে এখনও অসম্পূর্ণ)। সুপারস্ট্রিং তত্ত্বগুলি আবার নিজেরা স্ট্রিংতত্ত্ব ও সুপারগ্র্যাভিটি তত্ত্বের সমন্বয়। সুপারগ্র্যাভিটি তত্ত্ব হল সাধারণ আপেক্ষিকতা আর সুপারসিমেট্রির সমন্বয়। এর মধ্যে সাধারণ আপেক্ষিকতা একটি প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব কিন্তু সুপারসিমেট্রি-র উপস্থিতির কোনও প্রমাণ এখনও প্রকৃতিতে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এছাড়া স্ট্রিং-এর উপস্থিতিরও কোনও পরীক্ষামূলক প্রমাণ এখনও পর্যন্ত নেই (বা সেইরকম পরীক্ষা করার মত প্রযুক্তিও এখনও নেই)। এগুলি সবই এখনও পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে গাণিতিক”।

২) কণাজগতে উপস্থিত তিনটি কোয়ান্টাম বল (অর্থাৎ যাদের কোয়ান্টাম তত্ত্ব ইতিমধ্যে তৈরি করা গেছে)- তড়িৎচুম্বকীয়, দুর্বল বল ও সবল বল- এদের তুলনায় মহাকর্ষ অকল্পনীয় রকমের দুর্বল। একটি সহজ উদাহরণ থেকেই এটা বোঝা যায়ঃ গোটা পৃথিবীর টান উপেক্ষা করে একটি ছোট চুম্বক একটি লোহার পেরেককে তুলতে পারে। সেইজন্য কণাজগতের বেশীরভাগ ঘটনাবলীতে মহাকর্ষের প্রভাব নগণ্য। ফলে মহাকর্ষবিহীন স্ট্যান্ডার্ড মডেল (ও সংশ্লিষ্ট কোয়ান্টাম ক্ষেত্রতত্ত্ব) বেশীরভাগ কণাজাগতিক ঘটনাবলী অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করতে পারে। কেবল সেইসব পরিসর যেখানে মহাকর্ষ ক্ষুদ্র অঞ্চলে অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠে সেখানে স্ট্যান্ডার্ড মডেল অচল হয়ে পড়ে।

ভর হচ্ছে কোনো বস্তুর ভেতরে উপস্থিত মোট পদার্থের পরিমাণ। আর ওজন হচ্ছে ঐ পরিমাণ পদার্থকে পৃথিবী বা কাঠামো কত gravitational force এ নিজের দিকে টানছে। ওজন মূলত ভরেরই গুণক রাশি।ভরকে(m) অভিকর্ষজ ত্বরণ (g) দ্বারা গুণ করলেই ওজন (W) পাওয়া যাবে।

চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানের মতানুসারে ভর অপরিবর্তনশীল। কিন্তু আপেক্ষিকতার সূত্রানুযায়ী কোনো বম্তু আলোক বেগের কাছাকাছি কোনো বেগে অনবরত চলতে থাকলে তার গতিশীল ভর স্থিতিশীল ভর অপেক্ষা সম্প্রসারিত হয় অর্থাৎ বাড়তে থাকে। আর আলোর বেগে পৌঁছলে ভর হয় অসীম যা আর পরিমাপ করা যায় না।

যাই হোক, কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে স্থিতিশীল কাঠামোতে বস্তুর ভর অপরিবর্তনশীল।অর্থাৎ পৃথিবীতে 1 kg ভরের কোনো বস্তুর ভর চাঁদেও 1 kg, মঙ্গলেও।

কিন্তু ওজন?

হ্যাঁ, ওজন পরিবর্তিত হবে, কারণ ওজন gravity বা অভিকর্ষজ ত্বরণের উপর নির্ভর করে এবং আমরা সবাই জানি যে স্থানভেদে gravity পরিবর্তনশীল।পৃথিবীতে gravity 9.807 ms^-2(প্রায়), চাঁদে 1.62 ms^-2 এবং মঙ্গলে 3.711 ms^-2.

তাহলে, 1 kg ভরের বস্তুর উপর W=mg সূত্র প্রয়োগ করে পাই,

পৃথিবীতে ওজন, We=1 kg x 9.807 ms^-2=9.807 N.

অনুরূপভাবে, চাঁদে ওজন Wm= 1.62 N এবং মঙ্গলে WM= 3.711 N.

সুতরাং, পৃথিবীর তুলনায় মঙ্গলে বস্তুটিকে হালকা মনে হবে এবং চাঁদে মঙ্গলের তুলনায়ও হালকা লাগবে।

টান

কখনো কি ভীষণ বিস্ময়ে ভেবেছেন, আপনি পৃথিবীতে আটকে আছেন কেন? মহাকাশে ছিটকে পড়ছেন না কেন? এর একটিই উত্তর, মহাকর্ষ। এই বলটাই আপনাকে ভূপৃষ্ঠে আটকে রেখেছে। মহাকর্ষ ছাড়া আমরা কেউই পৃথিবীতে আটকে থাকতে পারতাম না, থাকতে হতো মহাশূন্যে ভেসে। অবশ্য তখন মহাবিশ্বও পরিণত হতো ঘন অন্ধকারাচ্ছন্ন ও বিশালাকৃতির গ্যাস আর ধূলিকণায়। মহাকর্ষ না থাকলে গ্রহ, নক্ষত্র, ছায়াপথ বলে কিছু থাকত না। কাজেই বলতেই হচ্ছে, মহাকর্ষের প্রভাব বলেন আর প্রতিপত্তি বলেন, তা বিশাল, বিপুল। অনেক বড় পরিসরের

“এই লেখাটা যাঁরা বিছানায় শুয়ে, বসে কিংবা মাটিতে দাঁড়িয়ে পড়ছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই জানেন মহাকর্ষ কী। অন্তত এটুকু নিশ্চয়ই জানেন, মহাকর্ষের টান না থাকলে এই লেখাটা পড়তে হতো মহাকাশে ভাসতে ভাসতে”।

মহাকর্ষের বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন

আসলে মহাকর্ষই পৃথিবীসহ অন্যান্য গ্রহ, নক্ষত্র ও ছায়াপথের গতি-প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করছে। সূর্যে শক্তি নিঃসরণ বা মহাকাশের দানব কৃষ্ণগহ্বরও তৈরি হচ্ছে ওই বলের কারণেই

অনেকে হয়তো ভাবছেন, মহাকর্ষ যদি এত দুর্বলই হয়, তাহলে মহাবিশ্বে তার গুরুত্ব আসলে কী? শক্তিশালী অন্য বলের কাছে মহাকর্ষ কি ধরাশায়ী হবে না? তাহলে গ্রহ আর নক্ষত্রগুলোকে মহাকর্ষ কীভাবে নির্দিষ্ট কক্ষপথে ধরে রেখেছে? অন্যান্য বলের প্রভাবে সেগুলো ছিটকে যাচ্ছে না কেন? কিংবা অন্য বলগুলো যদি এত শক্তিশালী হয়, তাহলে তারা মহাকর্ষের ওপরে প্রভাব বিস্তার করে মহাকর্ষ বলকে মহাবিশ্ব থেকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে পারছে না কেন”?

এর উত্তর হলো, অনেক বড় পরিসরে মহাকর্ষ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আবার বিপুল ভরের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ এই বল। দুর্বল ও সবল পারমাণবিক বল কাজ করে কেবল অতিক্ষুদ্র পরিসরে। কাজেই এ দুটি বলের সিংহভাগই শুধু অতিপারমাণবিক পরিসরে উপলব্ধি করা যায়। অন্যদিকে গ্রহ, নক্ষত্র ও ছায়াপথের চলাফেরায় বিদ্যুৎ–চৌম্বকীয় বলের বড় কোনো ভূমিকা নেই। কারণ, বিদ্যুৎ–চৌম্বকীয় বল দ্বিমুখী, কিন্তু মহাকর্ষ একমুখী

মহাকর্ষ শুধু বস্তুকে আকর্ষণ করে বা টানে,

মহাকর্ষ শুধু বস্তুকে আকর্ষণ করে বা টানে, বিকর্ষণ করে না। এর কারণ, বিদ্যুৎ–চৌম্বকীয় বলের সঙ্গে দুই ধরনের বৈদ্যুতিক চার্জ জড়িত। ধনাত্মক ও ঋণাত্মক। একইভাবে দুর্বল ও সবল পারমাণবিক বলেরও বৈদ্যুতিক চার্জের মতো ধর্ম রয়েছে, যাদের বলা হয় হাইপারচার্জ ও কালার। এগুলোর মানও ভিন্ন ভিন্ন। অন্যদিকে মহাকর্ষের মান সংশ্লিষ্ট বস্তুর ভরের সঙ্গে সম্পর্কিত”। 

মহাকর্ষের অবমূল্যায়নের স্বরূপ

আমরা জানি, আমাদের চারপাশের জগতে এই বলটা কাজ করছে। কিন্তু অনেকেই হয়তো জানেন না এই বলটা অদ্ভুত। জাত-ধর্মেও অন্যদের চেয়ে আলাদা। অসামাজিক। কারণ, মহাবিশ্বের অন্যান্য মৌলিক বলের প্যাটার্নের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, সেগুলোর সঙ্গে মহাকর্ষের কোনো মিল নেই। প্রথমত, অন্যান্য বলের তুলনায় মহাকর্ষ খুবই দুর্বল। আবার এই বল কখনো বিকর্ষণ করে না, সব সময় আকর্ষণ করে। শুধু কি তাই, কোয়ান্টাম জগতের সঙ্গেও এই বলকে খাপ খাওয়ানো যায় না। মোদ্দা কথা, মহাকর্ষ টানে সবাইকে, কিন্তু অন্যদের সঙ্গে বাঁধনে জড়ায় না

সবকিছুকে কোনো প্যাটার্নে খাপ খাওয়ানোর ইচ্ছা পদার্থবিদদের অনেক দিনের। এর একটি কারণ, তাঁরা পদার্থবিজ্ঞানের সবকিছুকে একত্র করে একটিমাত্র তত্ত্বের ভেতরে আনতে চান। অর্থাৎ একটিমাত্র তত্ত্ব দিয়ে মহাবিশ্বের সবকিছু ব্যাখ্যা করতে চান তাঁরা। একে বলা হয় থিওরি অব এভরিথিং বা সবকিছুর তত্ত্ব। এই চাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় বাধা মহাকর্ষ”।

আবার অন্য মৌলিক বলগুলোর সঙ্গে খাপ না খাওয়ার ব্যাপারটাও বেশ রহস্যময়। বিজ্ঞানীদের জন্য হতাশাজনকও বটে। কারণ, বিজ্ঞানীরা সবকিছুতে প্যাটার্ন খোঁজেন। অপরূপ মহাবিশ্বের বিচিত্রতা ও জটিলতা দেখলে অভিভূত না হয়ে আমাদের উপায় থাকে না

মহাবিশ্বের চারটি মৌলিক বলের মধ্যে মহাকর্ষই সবচেয়ে দুর্বল। কিন্তু কতটা দুর্বল?

সেটি শুনলেও অনেকের চোখ কপালে উঠে যেতে পারে। মোটা দাগে বললে, অন্য তিনটি মৌলিক বলের তুলনায় প্রায় ১০৩৬ ভাগ দুর্বল এই মহাকর্ষ। অর্থাৎ ১/১,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০ ভাগ। এত বড় সংখ্যা উপলব্ধি করা সহজ নয়। একটু সহজ উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুন, আপনার কাছে একটি পেঁপে আছে। পেঁপেটা কেটে চার ভাগ করলে এর প্রতিটি টুকরা হবে পেঁপেটির এক–চতুর্থাংশ। পেঁপেটাকে ১০৩৬  ভাগ করা হলে প্রতিটি টুকরোর আকার হবে পেঁপের একটি অণুর চেয়েও ছোট। আর পেঁপের একটি অণুর সমান টুকরার আকার করতে চাইলে আপনাকে প্রায় ২০ লাখ পেঁপে কেটে সমান ভাগে টুকরা করতে হবে”।

অন্যান্য বলের তুলনায় মহাকর্ষের দুর্বলতা কতটুকু, তা বুঝতে আরেকটা পরীক্ষা করা যায়। সে জন্য দরকার হবে একটি চিরুনি ও ছোট ছোট টুকরা করে কাটা কিছু কাগজ। শুকনা চিরুনিটা দিয়ে আপনার মাথার শুকনো চুল কিছুক্ষণ আঁচড়ে কাগজের টুকরার কাছে ধরুন। দেখা যাবে, কাগজের টুকরাগুলোকে চিরুনিটা আকর্ষণ করছে। কিছু কাগজ চিরুনির সঙ্গে লেগেও যাবে। এর কারণ স্থির বিদ্যুৎ। চিরুনির সামান্য বিদ্যুৎ–চৌম্বকীয় বলও কাগজের টুকরাগুলোকে চিরুনির সঙ্গে আটকে রাখে। অথচ কাগজের টুকরাগুলোর ওপর পৃথিবীর মহাকর্ষ কাজ করছে। কিন্তু গোটা পৃথিবীর মহাকর্ষও চিরুনির সেই আকষ৴ণ ঠেকাতে পারছে না। এতে বোঝা যায়, বিদ্যুৎ–চৌম্বকীয় বলের তুলনায় মহাকর্ষ কত দুর্বল। একটি ছোট চুম্বক লোহাজাতীয় কিছুর কাছে ধরলে তা বিশাল পৃথিবীর মহাকর্ষকে বুড়ো আঙুল দেখাবে”।

মহাকর্ষের দুটি কৌতূহলী ও অমীমাংসিত ধর্ম দেখা যাচ্ছে। প্রথমটা হলো অন্য বলগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে এই বলটা খুবই দুর্বল। দ্বিতীয়ত, বলটা শুধু আকর্ষণ করে।

কোয়ান্টাম মেকানিকসের মাধ্যমে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা না করতে পারার দুটো কারণ রয়েছে। প্রথমত স্ট্যান্ডার্ড মডেলে মহাকর্ষকে খাপ খাওয়াতে গেলে মহাকর্ষও কোনো কণার মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয় বলে কল্পনা করে নিতে হয়। কো

কোয়ান্টাম মেকানিকসের সবকিছুকে কণা হিসেবে বর্ণনা করা হয়। এমনকি বলগুলোখ্যা করা হয় এ তত্ত্বে। যেমন একটি ইলেকট্রন আরেকটি ইলেকট্রনকে ধাক্কা দেওয়ার কারণে দ্বিতীয় ইলেকট্রনটির যে চলাচল হয়, তার জন্য কোনো বল বা অদৃশ্য কোনো প্রভাব ব্যবহার করা হয় না। বরং পদার্থবিদেরা মনে করেন, এই মিথস্ক্রিয়ার কারণ একটি ইলেকট্রন আরেকটি ইলেকট্রনের দিকে একটি কণা ছুড়ে দেয়, যার মাধ্যমে তার কিছু ভরবেগ স্থানান্তরিত হয়। ইলেকট্রনের ক্ষেত্রে বলবাহী এই কণাকে বলা হয় ফোটন। অন্যদিকে দুর্বল বলের বলবাহী কণার নাম ডব্লিউ ও জেড বোসন। এই বলবাহী কণা বিনিময়ের মাধ্যমে দুর্বল বল কাজ করে। আর শক্তিশালী বল বিনিময় হয় গ্লুয়ন কণার মাধ্যমে।

কণাপদার্থবিজ্ঞানের স্ট্যান্ডার্ড মডেল

কোয়ান্টাম মেকানিকসের এই কাঠামোকে বলা হয় কণাপদার্থবিজ্ঞানের স্ট্যান্ডার্ড মডেল। এই মডেল প্রাকৃতিক জগতের অধিকাংশকে ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে অবিশ্বাস্য রকম সফল। কোয়ান্টাম কণার দৃষ্টিভঙ্গিতে জগতের অনেক কিছু ব্যাখ্যা করা যায়। এমনকি আমরা আগে দেখিনি এমন অনেক কিছুর ভবিষ্যদ্বাণীও করা যায়। যেমন এই মডেল ব্যবহার করেই হিগস বোসন কণার ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল। লার্জ হ্যাড্রন কলাইডারে ২০১২ সালে কণাটি শনাক্ত করাও সম্ভব হয়েছে। আবার দুর্বল বল কেন ক্ষুদ্র পরিসরে কাজ করে, তার ব্যাখ্যাও পাওয়া যায় এ মডেল থেকে। আসলে এ সামান্য একটা পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র কিংবা একটা ধ্রুবক যদি এদিক-ওদিক হয়ে যায়, তাহলে দেখা যাবে সেই কারণে এই মহাবিশ্ব গ্রহ, নক্ষত্র, অণু-পরামাণু বা জীবনের গঠন সবকিছুই মুহূর্তে হয়ে যাচ্ছে এলোমেলো।14-4-2023 PM 10:32

স্ট্যান্ডার্ড মডেলেও সুরাহ হচ্ছে না মহাকর্ষজনিত বৈজ্ঞানিক জটিলতা!

সব কণা, পদার্থ এবং অন্য তিনটি মৌলিক বলকে ব্যাখ্যা করা হয় কোয়ান্টাম মেকানিকস কেন্দ্রিক স্ট্যান্ডার্ড মডেলে। কোয়ান্টাম মেকানিকসে সবকিছুকে কণা হিসেবে বর্ণনা করা হয়। এমনকি বলগুলোকেও কণা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয় এ তত্ত্বে। যেমন একটি ইলেকট্রন আরেকটি ইলেকট্রনকে ধাক্কা দেওয়ার কারণে দ্বিতীয় ইলেকট্রনটির যে চলাচল হয়, তার জন্য কোনো বল বা অদৃশ্য কোনো প্রভাব ব্যবহার করা হয় না। বরং পদার্থবিদেরা মনে করেন, এই মিথস্ক্রিয়ার কারণ একটি ইলেকট্রন আরেকটি ইলেকট্রনের দিকে একটি কণা ছুড়ে দেয়, যার মাধ্যমে তার কিছু ভরবেগ স্থানান্তরিত হয়। ইলেকট্রনের ক্ষেত্রে বলবাহী এই কণাকে বলা হয় ফোটন। অন্যদিকে দুর্বল বলের বলবাহী কণার নাম ডব্লিউ ও জেড বোসন। এই বলবাহী কণা বিনিময়ের মাধ্যমে দুর্বল বল কাজ করে। আর শক্তিশালী বল বিনিময় হয় গ্লুয়ন কণার মাধ্যমে।

কোয়ান্টাম মেকানিকসের কাঠামোকে বলা হয় কণাপদার্থবিজ্ঞানের স্ট্যান্ডার্ড মডেল। এই মডেল প্রাকৃতিক জগতের অধিকাংশকে ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে অবিশ্বাস্য রকম সফল। কোয়ান্টাম কণার দৃষ্টিভঙ্গিতে জগতের অনেক কিছু ব্যাখ্যা করা যায়। এমনকি আমরা আগে দেখিনি এমন অনেক কিছুর ভবিষ্যদ্বাণীও করা যায়। যেমন এই মডেল ব্যবহার করেই হিগস বোসন কণার ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল। লার্জ হ্যাড্রন কলাইডারে ২০১২ সালে কণাটি শনাক্ত করাও সম্ভব হয়েছে। আবার দুর্বল বল কেন ক্ষুদ্র পরিসরে কাজ করে, তার ব্যাখ্যাও পাওয়া যায় এ মডেল থেকে।  

এত সফলতা সত্ত্বেও স্ট্যান্ডার্ড মডেলে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না কেন?

এত সফলতা সত্ত্বেও স্ট্যান্ডার্ড মডেলের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, একই উপায়ে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। কিন্তু কেন?

কোয়ান্টাম মেকানিকসের মাধ্যমে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা না করতে পারার দুটো কারণ রয়েছে। প্রথমত স্ট্যান্ডার্ড মডেলে মহাকর্ষকে খাপ খাওয়াতে গেলে মহাকর্ষও কোনো কণার মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয় বলে কল্পনা করে নিতে হয়। পদার্থবিদেরা এই হাইপোথেটিক্যাল কণার একটি গালভরা নামও দিয়েছেন‘গ্র্যাভিটন’। বাংলায় বলা যায় মহাকর্ষ কণা। এ কণার অস্তিত্ব যদি সত্যিই থাকে, তাহলে আপনি শুয়ে, বসে বা দাঁড়িয়ে যেখানেই থাকুন না কেন, আপনার দেহ থেকে অনবরত অতিক্ষুদ্র বলের মতো গ্র্যাভিটন কণা ছুটে যাচ্ছে ভূপৃষ্ঠের দিকে। আবার ভূপৃষ্ঠ থেকেও একই রকম কোয়ান্টাম কণা ছুটে আসছে আপনার দিকে। এই দুই মহাকর্ষ কণা বিনিময়ের কারণে আপনি পৃথিবীর বুকে আটকে থাকতে পারছেন। আবার পৃথিবী যে সূর্যের চারদিকে ঘুরে বেড়াতে পারছে, তার কারণও ওই গ্র্যাভিটন কণার অবিরাম স্রোত দুইয়ের মধ্যে বিনিময় হচ্ছে। এভাবে মহাকর্ষকে বেশ ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু এ ধারণার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো গ্র্যাভিটনের অস্তিত্ব পুরোটাই কাল্পনিক। বাস্তবে এ রকম কোনো কণার খোঁজ আজও পাওয়া যায়নি। অন্য বলগুলোর সঙ্গে মহাকর্ষের এই আপাত–অসংগতির অর্থ হতে পারে, আমরা যে প্যাটার্ন আবিষ্কার করেছি, সেটি সঠিক নয়, অথবা বড় কোনো কিছু আমরা এখনো বুঝতে পারছি না। কোনটা ঠিক? তা–ও অমীমাংসিত।

হাইয়েস্ট এনার্জেটিক রেডিয়েশনঃ সার্বিক একীভূতকরণ তত্ত্বের সহজ পথ!

যেভাবে বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা শুরু হয়

বস্তুর পারমাণবিকতার শুরু সেদিনের সে মুহুর্তে; যেদিন যে মুহুর্তে যে মানুষটি সর্ব প্রথম তার হাতের কোনো বস্ত দ্বিখন্ডিত করলো। খন্ডনের মাত্রা বা সংখ্যা-পরিমাণ যতই বেড়েছে মানুষ ততই অতিপারমাণবিকতার পথে এগিয়েছে। প্রাচীন গ্রীক বিজ্ঞানী-দার্শনিক ডেমোক্রিটাস এ পথে লাভ করেছিলেন অ্যাটমের ধারণা। অ্যারিস্টটল লাভ করেছিলেন চতুর্মাত্রিক যথাঃ ১) আগুন ২) বাতাস ৩) মাটি এবং ৪) পানি।মধ্যযুগে জাবির ইবনে হাইয়ান এ পথে লাভ করেছিলেন দ্বিমাত্রিক ধারণা যা অআধুনিক বিজ্ঞানে পর্যায় সারণী বলা হয়।ভাবে বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার প্রায় পরিসমাপ্তি ঘটে

আধুনিক বিজ্ঞানের রেন্জ বা পরিধিঃ বলা হয়ে থাকে, “বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা সেদিক থেকে শুরু যেদিন মানব মনে সত্যকে জানার আগ্রহ জেগেছিল”।

মানব তার উষালগ্ন থেকে সত্যকে জানার জন্য সত্য থেকে সত্যান্তরে পৌঁছতে গিয়ে একেবারে মহাসত্যের দ্বারপ্রান্তে সেদিন পৌঁছে যায় যেদিন বিজ্ঞানীরা এই মহাবিশ্ব কখন কিভাবে শুরু হয়েছিল। এমনকি শুরুর পূর্বাবস্থা সম্পর্কেও সম্যক অবহিত হয়েছিলেন। কেবল একটি মাত্রই প্রশ্ন এবং তার উত্তর বাকী ছিল যে প্রশ্নোত্তরে নিহিত ছিল সত্যকে জানার আগ্রহের অগ্রযাত্রার চির পরিসমাপ্তি। যেহেতু প্রশ্নও জাগেনি যে, বিগ ব্যাং পূর্বাবস্থা হাইয়েস্ট এনার্জেটিক রেডিয়েশনের পূর্বাবস্থা কি ছিল যাতে নিহিত রয়েছে মহাবিশ্বের মহাসত্য।

অবশ্য আইনস্টাইনের আমল থেকে বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার পরিসমাপ্তির লক্ষ্যে আইজ্যাক নিউটনের দর্শনের বাইরে ভিন্ন পথে বিজ্ঞানীরা অগ্রসর হয়েছিলেন। নিউটনের মতে, সত্য সহজ পথে অবস্থিত। কিন্তু বিজ্ঞানীরা কঠিন পথে অগ্রসর হয়েছিলেন। কঠিন পথটি হচ্ছেঃ অতিপারমাণবিকতার অন্দর মহলে প্রবেশ। ফলে যা হবার তাই ঘটে বিজ্ঞান জগতে। মহাকাশের যেমন সীমানা নেই। কেবল এটা জানা যে, জানা মহাকাশের চেয়ে অজানা মহাকাশ অ-নে-ক অ-নে-ক অ-নে-ক বড়! অনুরূপ জানা সত্যের চেয়ে অজানা সত্য অনেক গভীর থেকে গভীরাভ্যন্তের, অ-নে-ক অ-নে-ক অ-নে-ক অতল তলে অবস্থিত। কত বড় কিংবা কত অতল তলে তলায়িত –এই প্রশ্নের বৈজ্ঞানিক উত্তরঃ জানি না। বিজ্ঞানীদের দাবীঃ এমন প্রশ্ন রয়েছে যার উত্তর জানা বিশ্বে কখনও পাওয়া যাবে না।

মনে হয়, বিজ্ঞানীরা এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছেন যে, যার সদুত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। বরং যতই পারমাণবিকতার গভীর থেকে গভীরাভান্তরে পৌঁছছে ততই যে অজানার হার দ্রুত বেড়ে চলেছে। এই অজানার হার বর্তমানে ৯৫-৯৬ শতাংশে ঠেকেছে। অর্থাৎ জানার হার ৪ থেকে ৫ শতাংশ।বাকী ৯৫-৯৬ শতাংশ থেকে যাচ্ছে অজানা । এই অজানাকে বিজ্ঞানীরা দুই ভাগে ভাগ করেছেন যথাঃ ডার্ক এনার্জি এবং ডার্ক ম্যাটার যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায় অজানা শক্তি এবং অজানা বস্তু। উল্লেখ্য, ডার্ক এনার্জি-ডার্ক ম্যাটার মহাকর্ষ বলের প্রতিবল গ্র্যাভিটন কণার মতো নিছক কল্পনাপ্রসূত কোনো বিষয় নয় বরং অদৃশ্য কোয়ার্ক স্ট্রেন্জের মতো জীবন্ত অস্তিত্বশীল । তাই বিষয়টি নিছক টেলিপ্যাথি বলে উড়িয়ে দেবার মতো নয়।

বিজ্ঞানীরা তাই এখন সময় ব্যয় করছেন ডার্ক এনার্জি নামক অজানা শক্তি এবং ডার্ক ম্যাটার নামক অজানা বস্তুটা কি, কীভাবে। এরি মধ্যে করোনা কোভিডের দীর্ঘমেয়াদী বিশ্ব সংক্রমণ, তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধের আশংকা, বৈশ্বিক উষ্ঞায়নের ফলে পরিবেশ বিপর্যয়, থেমে থেমে ভিন গ্রহের অতিবুদ্ধিমান এলিয়েনের আনাগোনায় বিজ্ঞানীদের জন্য জরুরী হয়ে দেখা দিয়েছে আইনস্টাইনের স্বপ্নিল সার্বিক একীভূতকরণ তত্ত্বের উদ্ভাবন। অবশ্য এ লক্ষ্যে তার মৃত্যুর অন্ততঃ ১৫ বছরের মাথায় বিজ্ঞানীরা ৪ মহাবলের ৩ বল-কে একীভূত করতে সক্ষম হলেও ৪র্থ বল মহাকর্ষের সাথে বাকী ৩ বলের সাথে কোনো মতেই একীভূতকরণ সম্ভবপর হচ্ছে না, শুধু তাই নয়, পদার্থবিজ্ঞানের অপরিহার্য প্রতিবল গ্র্যাভিটন যেন এখন বিজ্ঞান জগতের জন্য আমাবশ্যার চাঁদ বা সোনার হরিণ হয়ে আছে। তাছাড়া, নিউট্রিনোর অদ্ভূত আচরণ, বায়ুর প্রবল উর্ধ্বচাপ উপেক্ষা করে আমাদের দেহ পৃথিবীর ভূত্বকে আটকে থাকায় দূর্বল মহাকর্ষ বলের সক্ষমতা কতটুকুন, ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্তের অভ্যন্তরে এমন কী ঘটছে যে, আলো পর্যন্ত ফিরে আসতে পারছেনা-এমন সব ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত চিন্তা-ভাবনা বিজ্ঞানীদের পেয়ে বসেছে । ফলে সার্বিক একীভূতকরণের তত্ত্বের উদ্ভাবন বিজ্ঞানীদের জন্য যেন ক্রমেই আকাশ কুসুম কল্পনা হয়ে দাঁড়াচ্ছে । সির্ণ মনে করে, নিউটনীয় চিন্তাধারায় সহজ পথে দ্রুত সার্বিক একীভূতকরণ তত্ত্বে পৌঁছা সম্ভবপর হতে পারে। আর তা মহাকর্ষ বল-কে কেন্দ্র করেই।

আইনস্টাইন মনে করেন, সব ধরণের শক্তিই হলো মহাকর্ষের উৎস। কারণ সব শক্তিরই একটা কার্যকর ভর রয়েছে। (বিজ্ঞানচিন্তা, জানুয়ারি, ২০২১,পৃষ্ঠা ৬৩)।

আইনস্টাইনের ভরশক্তির সমীকরণ                                      

বস্তু এবং শক্তিঃ জমে থাকা শক্তি জমাটবদ্ধ বস্তুর মতই (আইনস্টাইন)।

“ভর এবং শক্তিঃ সব শক্তিরই একটা কার্যকর ভর রয়েছে” (আইনস্টাইন)। (বিজ্ঞানচিন্তা, জানুয়ারি, ২০২১,পৃষ্ঠা ৬৩)।

মহাকর্ষ বল শুন্য কোনো স্থানের কল্পনা করাও অসম্ভব (বিজ্ঞানচিন্তা, মার্চ, ২০২০,পৃষ্ঠা ২১)।

“মহাকর্ষ বলের প্রাবল্য যেখানে কম, সেখানে আপনার ওজন কম হবে, নিজেকে তত হালকা মনে করবেন আপনি। আর মহাকর্ষ প্রাবল্য খুব বেশি যেখানে, সেখান থেকে পা তুলতেই আপনি হিমশিম খাবেন” (বিজ্ঞানচিন্তা, মার্চ, ২০২০,পৃষ্ঠা ২১)।

“মহাকর্ষীয় ভর বলে আমরা যেটাকে জানি, যার কারণে আমাদের ভারী ও হালকা অনুভূতি হয়, সেটা আসলে ওজন (বিজ্ঞানচিন্তা, মার্চ, ২০২০, বর্ষ ৪, সংখ্যা ০৬, পৃষ্ঠা ২০)।

“ভর ভেক বদল করে শক্তিতে রূপান্তিরত হয়” (বিজ্ঞানচিন্তা, মার্চ, ২০২০,পৃষ্ঠা ২০)।

আইনস্টাইন মনে করেন, সব ধরণের শক্তিই হলো মহাকর্ষের উৎস। কারণ সব শক্তিরই একটা কার্যকর ভর রয়েছে। (বিজ্ঞানচিন্তা, জানুয়ারি, ২০২১,পৃষ্ঠা ৬৩)।

আইনস্টাইনের মতে, সব ধরণের শক্তি যদি মহাকর্ষের উৎস হয় তাহলে সব ধরণের শক্তির উৎস মূল কি অথবা কোথায়? সির্ণ মনে করে, এ প্রশ্নের উত্তর রয়েছে আইজাক নিউটন উক্ত সত্য সহজ পথে অবস্থিত-এই সূত্রে কিংবা অপেক্ষাকৃত কঠিন তত্ত্বে। তত্ত্বটি হচ্ছে স্ট্রিং থিওরি। সহজ পথটি রয়েছে অআইনস্টাইনের ভরশক্তি সমীকরণের মধ্যে। এ মতে, বস্তু এবং শক্তিঃ জমে থাকা শক্তি জমাটবদ্ধ বস্তুর মতই (আইনস্টাইন)।

“ভর এবং শক্তিঃ সব শক্তিরই একটা কার্যকর ভর রয়েছে” (আইনস্টাইন)। (বিজ্ঞানচিন্তা, জানুয়ারি, ২০২১,পৃষ্ঠা ৬৩)। যেহেতু ভর এবং শক্তি, এবং শক্তি এবং ভর, এবং বস্তু এবং ভর, ভর এবং বস্তু, বস্তু এবং শক্তি সমার্থক সেহেতু ডার্ক এনার্জি আর ডার্ক ম্যাটার সমার্থক। প্রশ্ন হচ্ছে ডার্ক এনার্জি আর ডার্ক ম্যাটারের উৎসমূল কি অথবা কোথায়? এ প্রশ্ন রয়েছে এমন এক স্থানের যা হচ্ছে বিগ ব্যাংয়ের উৎসমূল যা কসমোলজিক্যাল স্ট্যান্ডার্ড থিওরিতে বিগ ব্যাং তত্ত্বের সাথেও অআবিস্কৃত হয়েছে। বিগ ব্যাংয়ের উৎসমূলটি স্ট্যান্ডার্ড থিওরিমতে হাইয়েস্ট এনার্জেটিক রেডিয়েশন। বিষয়টি প্রকৃতি শব্দের মতই কোনো প্রকার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণবিহীন যার ফলে হাতের কাছেই সার্বিক একীভূতকরণ তত্ত্বটি অআমাদের দৃষ্টির বাইরে থেকে যাচ্ছে। সির্ণ মনে করে বিগ ব্যাং তথা মহাবিশ্বের বীজ হচ্ছে হাইয়েস্ট এনার্জেটিক রেডিয়েশন যার বিস্ফোরণে অদৃশ্যমান রয়েছে ডার্ক এনার্জি+ডার্ক ম্যাটার নামে ৯৫ থেকে ৯৬ শতাংশ। দৃশ্যমান আছে ৪ থেকে ৫ শতাংশ। কণা পদার্থ বিজ্ঞান তথা কসমোলজিক্যাল স্ট্যান্ডার্ড থিওরিমতে, বিগ ব্যাংয়ের শুরুতেও ৪ মহাবল একীভূত ছিল। তার অর্থ বিগ ব্যাং পূর্ব হাইয়েস্ট এনার্জেটিক রেডিয়েশনে এই ৪ বল একীভূত ছিল। সুতরাং, হাইয়েস্ট এনার্জেটিক রেডিয়েশনই হতে পারে ৪ বলের সার্বিক একীভূতকরণের মূলোৎস। 

স্ট্রিং থিওরিঃ সার্বিক একীভূতকরণ তত্ত্বের বিকল্প পথ

সম্ভবতঃ সার্বিক একীভূতকরণে হাইয়েস্ট এনার্জেটিক রেডিয়েশনই হতে পারে নিউটন উক্ত সত্যে পৌঁছার সহজ-সরল পথ ছিল। কিন্ত্ত বিজ্ঞানীরা অপেক্ষাকৃত কঠিন পথে অর্থাৎ অতিপারমাণবিকতার অন্দর মহলে প্রবেশ করে সরেজমিনে সত্যান্বেষণের পথ-পন্থা বেছে নেন। যদিও তাতে জানার চেয়ে অজানার হার অনেক অনেক বেশি তথাপি সত্য থেকে সত্যান্তরের অনেক পথ অতিক্রমন করে এমন অভাবনীয় কৃতিত্ব অর্জন করেছে। এতেও রয়েছে সার্বিক একীভূতকরণ তত্ত্বের বীজ। তত্ত্বটি হচ্ছে বর্তমান বিজ্ঞান জগতের বহুল অআলোচিত, বহুল প্রত্যাশিত এবং প্রমাণিত তত্ত্বটির নাম স্ট্রিং থিওরি।  বলা যায় - তত্ত্বটি সার্বিক একীভূতকরণের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছে মডার্ণ কসমোলজিক্যাল স্ট্যান্ডার্ড মডেলকে যা সত্যি অভিনন্দনযোগ্য। এই কৃতিত্ব রয়েছে স্ট্রিং থিওরির মধ্যে।

উল্লেখ্য, মডার্ণ কসমোলজিক্যাল স্ট্যান্ডার্ড মডেল থিওরি মতে, শক্তির শুরু নেই, শেষ নেই, লয়ও নেই ক্ষয়ও নেই যাকে পদার্থ বিজ্ঞানে বলা হয় শক্তির নিত্যতা সূত্র বা সংরক্ষণশীলতা নীতি (Conservation Law of Energy) আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব থেকে প্রমাণিত হয় যে ভর এবং শক্তি পরস্পর সম্পর্কিত (E=mc2) । E=mc2 সমীকরণটি ভর-শক্তি সমতা নির্দেশ করে এবং বিজ্ঞান বর্তমানে এটি মেনে নিয়েছে যে কোনো বস্তুর ভর-শক্তি সংরক্ষিত (সূত্রঃ https://bn.wikipedia.org/wiki/শক্তির_নিত্যতা)।বস্তুতঃপক্ষে শক্তির এই নিত্যতা বা সংরক্ষণশীল নীতিকে কারও কারও মতে অসীম সত্বার ইংগিত করে। কেহ কেহ এই অসীম সত্বাকে প্রকৃতি (নেচার) রূপে অভিহিত করে থাকে। 

প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, মহাবিশ্বের কেন্দ্রমূলে একটা সত্বাকে স্বতঃস্ফুর্তভাবে বিজ্ঞান যে নামে অভিহিত করে তার নাম প্রকৃতি যার উপর ভিত্তিশীল ফিজিক্স।


 



Comments

Popular posts from this blog

সৃষ্টি তত্ত্ব

স্ট্রিং (বাংলা) তত্ত্ব DRAFT

বিশ্ব জগৎ এবং তার বুদ্ধিদীপ্ত ক্রম বিকাশের ইতিহাস