স্ট্রিং (বাংলা) তত্ত্ব DRAFT
স্ট্রিং (বাংলা) তত্ত্ব
তাত্ত্বিক
পদার্থ বিজ্ঞান মতে কণার স্বরূপ
কণা তাত্ত্বিক
পদার্থ বিজ্ঞানের মতে, মৌলিক কনিকারা হল মাত্রাহীন বিন্দুর মত। জ্যামিতিক ভাষায় বিন্দুর
সংজ্ঞা হচ্ছে: “যার দৈর্ঘ্য প্রস্থ ও উচ্চতা নেই তাকেই বিন্দু বলে”। অর্থাৎ যে কণার
দৈর্ঘ্য,প্রস্থ ও উচ্চতা নেই , বাস্তবে তার কোন মাত্রাও থাকার কথা নয়।সুতরাং, কণা
তাত্ত্বিক পদার্থ বিজ্ঞানের মতে, মৌলিক কনিকারা হলো অনুরূপ মাত্রাহীন বিন্দুদের মত।
স্ট্রিং তাত্ত্বিক পদার্থ বিজ্ঞান মতে কণার স্বরূপ
পক্ষান্তরে স্ট্রিং থিওরি মতে, মৌলিক কণিকারা মাত্রাহীন বিন্দুর
মত নয়, বরং এগুলো হলো একমাত্রিক তারের মত। একটি তারের যেমন শুধু দৈর্ঘ্য আছে; মৌলিক
কণারাও ঠিক তেমনি। এ কারণেই এই তত্ত্বের নামও হয়েছে স্ট্রিং থিওরি বা তার-তত্ত্ব।(সূত্রঃ
https://www.linkedin.com/pulse/সটর-থওর-বজঞনদর-আশর-আল-ramzan-hossain/)।
স্ট্রিং থিওরিমতে কণাগুলি কম্পমান অতি
সূক্ষ্ণ সুতা/তারের ন্যায়
স্ট্রিং থিওরীমতে, প্রাপ্ত কণাগুলো অসলে এক ধরণের সুতার কম্পন যা আমরা কণা (পার্টিকেল) হিসাবে দেখে থাকি।
স্ট্রিং থিওরিমতে কম্পমান সূক্ষ্ণ সুতা/তারের উৎসমূল শক্তি (Energy)
জার্মান পদার্থ বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব E=mc2 সমীকরণমতে বস্তু ও শক্তি আসলে সমার্থক। (বিজ্ঞান চিন্তা পৃঃ ৪৪)। ... “তাই জমে থাকা শক্তিও জমে থাকা বস্তুর মত” (পৃঃ ৩৫)।
স্ট্রিং থিওরীর মূল লক্ষ্যঃ
স্ট্রিংগুলোর কোয়ান্টাম অবস্থা ও বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে প্রকৃতিতে
বিদ্যমান সকল মৌলিক কনিকার আচরণ ব্যাখ্যা করা স্ট্রিং থিওরীর মূল লক্ষ্য।
স্ট্রিং থিওরী দিতে যাচ্ছে পুরাতন পৃথিবীকে নতুন বিজ্ঞান উপহার!
স্ট্রিং তত্ত্বমতে,
মহাবিশ্বের কণাগুলো যে বিন্দুতে বসে আছে, ওগুলো অ্যাবসুলেট মিনিমাম নয়। লোকাল মিনিমাম।
একটা সময় গিয়ে লোকাল মিনিমাম অবস্থা ভেঙ্গে প ড়তে পারে। তখন কণাগুলো আর এই বিন্দুতে
থাকতে পারবে না। চলে যাবে অ্যাবসুলেট মিনিমাম শক্তির বিন্দুতে।আর সেই বিন্দুগুলো আসলে
আলাদা আরেকটা মহাবিশ্বের (যেটা আসলে অ্যাকচুয়াল মহাবিশ্ব) অংশ। তাই লোকাল অবস্থা ভেঙ্গে
পড়লে আমাদের বর্তমান মহাবিশ্বের আর অস্তিত্ব থাকবেনা। এই মহাবিশ্বের সব উপাদান চলে
যাবে আরেকটা মহাবিশ্বে....এটা যদি ঘটে, তাহলে মহাবিশ্বের তাপীয় মৃত্যুর আগেই আমরা
অ্যাকচুয়াল মহাবিশ্বে চলে যাব (বিজ্ঞানচিন্তা, জানুয়ারি ২০২০, পৃঃ ৪৮)।
কণাবাদি পদার্থবিদ্যার স্ট্যান্ডার্ড মডেল যেসব কনিকাদের নিয়ে কাজ করে, স্ট্রিং থিওরি স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই এসব কনার সাথে চমৎকারভাবে মহাকর্ষের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে পারে। এ কারণে বিজ্ঞানীরা আশাবাদী যে, মহাজাগতিক সবকিছুর তত্ত্ব হিসাবে স্ট্রিং থিওরি সকল কাজের কাজী হওয়ার দাবী রাখে অর্থাৎ এই তত্ত্বের নিজস্ব গানিতিক মডেলের সাহায্যে স্ট্রিং থিওরি প্রকৃতিতে বিদ্যমান চারটি মৌলিক বল, সকল প্রকার শক্তি ও পদার্থের যেকোনো অবস্থাকে ব্যাখ্যা করতে পারে। এই তত্ত্বের অনুকল্পগুলো (হাইপোথিসিস) আজকাল কণাবাদী পদার্থবিজ্ঞানের ব্যবহৃত হচ্ছে। বস্তুতঃ স্ট্রিং থিওরীর ধারণাগুলো আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের এক গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার এবং কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি ও কোয়ান্টাম গ্রাভিটির (মহাকর্ষের কোয়ান্টাম রুপ) সকল ধোঁয়াশা দূর করে আমাদের পুরাতন পৃথিবীতে এক নতুন পদার্থবিজ্ঞান উপহার দিচ্ছে।
যদি প্রশ্ন করা হয়, মহাবিশ্বের উৎপত্তি কিভাবে? তাহলে এর উত্তরের জন্য নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক উৎস হবে মডার্ণ কসমোলজিক্যাল স্ট্যান্ডার্ড মডেল থিওরি। এই থিওরিমতে বলা যায়, মহাবিশ্বের উদ্ভব বিগ ব্যাং থেকে। বিগ ব্যাং কিসের বিস্ফোরণে ঘটেছিল? তারও উত্তর রয়েছে এমসিএসএম থিওরিতে। এই থিওরি বলছে, বিগ ব্যাং ঘটেছিল হাইয়েস্ট এনার্জেটিক রেডিয়েশনের বিস্ফোরণ থেকে? যদি প্রশ্ন করা হয়, হাইয়েস্ট এনার্জেটিক রেডিয়েশনের পূর্ব কি ছিল? এর উত্তর পাওয়া যায় বিগ ব্যাং থিওরির প্রবক্তা বৃটিশ পদার্থ বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংয়ের মন্তব্যে। তিনি দাবী করেন, হাইয়েস্ট এনার্জেটিক রেডিয়েশনের পূর্বে মহাবিশ্ব ব্যাপক শুন্যময় ছিল। তাঁর দাবী শুন্য থেকে হাইয়েস্ট এনার্জেটিক রেডিয়েশন তথা মহাবিশ্বের উদ্ভব ঘটেছিল। চূড়ান্ত প্রশ্ন হতে পারে, শুন্যময় অবস্থার আগে কি ছিল? এ প্রশ্নের পরোক্ষ উত্তর রয়েছে এমসিএসএম কোয়ান্টাম থিওরিতে। এই থিওরিতে শুন্যে শক্তি বিরাজ করা নতুন কিছু নয়। এতে সুস্পষ্ট প্রতীয়মান যে, মহাবিশ্বের উদ্ভব তথা বিগ ব্যাং, হাইয়েস্ট এনার্জেটিক রেডিয়েশনের পূর্বে যে শুন্যাবস্থা তাতে বিদ্যমান ছিল কেবল শক্তি আর শক্তি।
শক্তি
পরিচিতি
আইনস্টাইনের ভরশক্তি সমীকরণ তথা স্পেশাল রিলিটিভিটি থিওরির মূল কথা ভরশক্তি। এমতে যা ভর তা-ই শক্তি, যা শক্তি তা-ই ভর। অর্থাৎ জমে থাকা শক্তি জমে থাকা বস্তুর মতই। সেমতে বস্তু+ভর+শক্তি সমার্থক।
পদার্থবিজ্ঞান
ও রসায়নে শক্তির নিত্যতার সূত্র জানায় যে কোনো একটি বদ্ধ সিস্টেমের শক্তি সর্বদা
ধ্রুব থাকে; এটি সময়ের সাথে পরিবর্তনশীল নয়। এর মানে এই যে শক্তির কোনো সৃষ্টি বা
ধ্বংস নেই; বরং এটি কেবল এক রূপ থেকে অন্য রূপে স্থানান্তরিত হয়। এই শক্তির নিত্যতার
সূত্রটি সর্বপ্রথম প্রস্তাব এবং পরীক্ষা করেন এমিলি দ্যু শাতলে ।
শক্তির
নিত্যতা তত্ত্ব
“প্রত্যেক
বিষয়বস্ত্ত মূলে পৌঁছে” (ফারাবী আল আরাবি)। বস্ত্তগত বিবেচনায় এই মূল হচ্ছে শক্তি।
স্ট্রিং থিওরিতে রয়েছে এই শক্তির চমৎকার মেরুকরণ যার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিম্নরূপঃ
আইনস্টাইনের
তত্ত্বমতে, কোনো বস্ত্তর আয়ুস্কাল ফুরাতে শুরু করলে বস্ত্তটির ভর, শক্তি আস্তে আস্তে
চুপসে যেতে থাকে। এভাবে চুপতে চুপতে এক সময় পরিণত হয় এক পরম বিন্দুতে যাকে সিঙ্গুলারিটি
বলা হয়। কণা পদার্থ বিজ্ঞানমতে প্রতিটি অণু-পরমাণু কম্পমান। স্ট্রিং থিওরিমতেও কণাগুলো
কম্পনশীল। CIRNN
এর মতে, এই কম্পনের উৎসমূল শক্তি।
সূত্রঃ নিউটনের
প্রথম সূত্র বলে, “বাহ্যিক কোন বল প্রয়োগ না করলে স্থির বস্তু চিরকাল স্থির ও গতিশীল
বস্তু চিরকাল গতিশীল থাকবে”। এককথায়, বস্তু নিজে তার অবস্থার
পরিবর্তন করতে পারেনা, করতে হলে বাইরের বল (শক্তি) প্রয়োজন।
স্ট্রিং তত্ত্বের নিউটনীয় পরীক্ষাঃ অতি সূক্ষ্ণ বা চিকন (সরু) শক্ত কয়েক ফুট লম্বা একটি স্ট্রিং বা তার নিই । মনে মনে তারটিকে A, B এবং C-তে ভাগ করি। তারের অগ্রভাগ-কে A, মধ্যম অংশ-কে B এবং প্রান্ত বা শেষ অংশকে C ধরি। অতঃপর তারটির অগ্রভাগ এবং শেষ ভাগ-কে টান টান ভাবে শক্তভাবে বেধে রাখি। দেখা যাবে, তারটি কোনো প্রকার কম্পন এবং শব্দ ছাড়াই নিরব-নিথরভাবে নিস্ক্রীয় পড়ে আছে। এরপর তারটির মধ্যভাগে হালকাভাবে দৈহিক শক্তি প্রয়োগে তর্জনী আঙ্গুল দ্বারা নাড়া দিলে দেখা যাবে, তারটি ক্রমশঃ সক্রিয় হয়ে মৃদু কম্পন এবং মৃদু শব্দ সৃষ্টি করছে। যতই তারের মধ্যভাগে শক্তিবৃদ্ধি করে যত দ্রুত নাড়া দেয়া হয় তত বেশি কম্পন এবং শব্দ সৃষ্টি হবে। এখানে কম্পন এবং শব্দের উৎসমূল দাঁড়াবে শক্তি (Energy)।
শক্তির নিত্যতা:
শক্তির নিত্যতা বা থার্মোডিনামিক্সের ১ম সূত্র বলে “শক্তির কোন সৃষ্টি নেই, ধ্বংস নেই
এটা কেবল একরূপ থেকে অন্যরূপে রূপান্তরিত হয়।” মহাবিশ্ব হচ্ছে শক্তির সমষ্টি। E=mc2 সূত্রানুসারে বস্তুর ভরটাও হল শক্তি। প্রশ্ন, এই শক্তি
উৎস কী?
বলা হয়ে থাকে, শুন্যের উৎসমূল শূণ্যতা থেকে। প্রশ্ন হতে পারে, শূণ্য মানে কি
শুধুই শুন্য অর্থাৎ কিছুই নয় কিংবা কিছুই না? এর উত্তর Modern Cosmological
Standard Model এর কোয়ান্টাম থিওরি মতে, শূণ্যতা আসলে শূন্যতা নয় এটা হল বিশাল হিগস ক্ষেত্র।
এর ভেতরে আছে কোয়ান্টাম ফ্ল্যাকচুয়েশন ভ্যাকুয়াম এনার্জি!
প্রশ্ন হল, এই ভ্যাকুয়াম এনার্জিটা কোথা থেকে আসে? যেহেতু এটা একটা এনার্জি (শক্তি)
তাই এই শক্তিটা অন্যকারো রূপান্তরিত রূপ হতে বাধ্য।
শূণ্য থেকে শূণ্য হয়, শূণ্য থেকে শক্তি হয়না। কথিত শূণ্যতার ক্ষেত্রে ভ্যকুয়াম এনার্জি থাকে এটা
ভাল। কিন্তু এই ভ্যাকুয়াম এনার্জি কই থেকে আসে তার তার বিশ্নেষণ কি কখনো বিবেচনা করা
হয়েছে ?
শক্তি নিজেই পরিচয় বহণ করে সে অন্যকারো পরিবর্তিত রূপ। তাহলে গোড়ায় একটি আদিম বা প্রাইমেটিভ
শক্তির অস্তিত্ব বাধ্যতামূলক। প্রশ্ন হল, ওই প্রাইমেটিভ শক্তিটা কি ছিল? শুরুতে এমন
কোন প্রাইমেটিভ শক্তি ছিল যা শূণ্যতাকেও ভ্যাকুয়াম এনার্জি দিল?
মহাবিশ্বের
সবকিছু পরিবর্তনশীল। প্রশ্ন হল পরিবর্তন কি স্বত:স্ফূর্ত? নিজে নিজে হতে পারে? নিউটনের
প্রথম সূত্র বলে, “বাহ্যিক কোন বল প্রয়োগ না করলে স্থির বস্তু চিরকাল স্থির ও গতিশীল
বস্তু চিরকাল গতিশীল থাকবে”। অর্থাৎ, বস্তুর অবস্থার
পরিবর্তনে বাইরের বল (শক্তি) প্রয়োজন।
মেরু (ঠান্ডা) অঞ্চলের প্রাণীদের
চর্বি বেশী থাকবে, মরুভূমিতে থাকলে উঠের পানি সঞ্চয়ে জন্মগত সুব্যবস্থা-একটি সুচিন্তিত, সুপরিকল্পিত, গভীর জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বিবেক, বুদ্ধিমত্তার উৎস কী? এই নকশা- প্লান -ব্লুপ্রিন্ট কোথা
থেকে এল? প্রকৃতি? প্রকৃতি কি বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন কোন অস্তিত্ব যার প্ল্যানিং এর ক্ষমতা
আছে? অবশ্য প্রকৃতি নামটা ঈশ্বরের সমার্থ হিসাবে ব্যবহৃত হয়। সেটা বাদ দিয়ে যদি প্রকৃতি
মানে যদি আবহাওয়া জলবায়ু ইত্যাদির সমষ্টি বিবেচনা করি তবে এগুলোর কি স্বাধীন বুদ্ধিমত্তা
আছে? যদি না থাকে তো বৈচিত্রময় প্রাণিজগত তৈরীর জন্য কোন গ্রান্ড ডিজাইনারের প্রয়োজন
আছে কি নেই সেটা ভাববার বিষয়।(https://m.somewhereinblog.net/mobile/blog/colonel/29889625)।
বাস্তব
জীবনে স্ট্রিং
প্রত্যাহিক জীবনে শব্দ এবং কম্পন বিভিন্ন উপায়ে সংঘটিত হয়ে থাকে এবং তাতে অনেক ফলাফল বা আউটপুট থাকে। যেমন মশার পাখাদ্বয়ের অনবরত কম্পনে সৃষ্টি হয় ছোটখাটো জাম্বো জেটের ন্যায় শব্দ যা খানিকটা বিরক্তিকর বটে। মাথার উপর নিত্য যে তিন পাখা বিশিষ্ট বৈদ্যুতিক ফ্যান প্রচন্ড শক্তিতে সশব্দে ঘুরছে তার ফলাফলস্বরূপ আমরা সুশীতল বাতাস পেয়ে থাকি । প্রোটন প্রোটনে প্রচন্ড শক্তিতে মুখোমুখি সংঘর্ষের ফলাফলে ল্যার্জ হ্যাড্রন কলাইডারে CERN পেয়েছে অজস্র অণু-কণার মধ্যে হিগস বোসনও। কারো কারো মতে ইলেকট্রন কিংবা কোয়ার্কে এ ধরণের সংঘর্ষে পাওয়া যেতে পারে স্ট্রিং কিংবা অতিপারমাণবিক অন্য কোনো অণু-কণা। কারণ, এ পর্যন্ত কোনো বস্ত্ত-পদার্থ ভাঙলে পরম বিন্দু বা স্ট্রিংরূপে পাওয়া যাচ্ছে কেবল ইলেকট্রন এবং কোয়ার্ক। যাকে বলা যায় জোড়া জোড়া সৃষ্টি। মহাবিশ্বের ৪ বলের মধ্যে ৩ বলেরই জোড়া পাওয়া গেছে। মহাকর্ষের জোড় গ্র্যাভিটন পাওয়ার জোর সন্ধান করছেন বিজ্ঞানীরা।
উল্লেখ্য, স্ট্রিং তত্ত্বের সত্যতার বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতির জন্য বেঁধে দেয়া হয়েছে তিন জটিল শর্ত। তন্মধ্য অন্যতম হচ্ছে স্ট্রিং তত্ত্বে মহাকর্ষের পাশাপাশি গ্র্যাভিটনের অস্তিত্ব থাকতে হবে। এটি একটি জটিল শর্ত। এ শর্ত পূরণে এগিয়ে আসেন জোয়েল শার্ক এবং জন শোয়ার্জ। একটা হাইপোথেটিক্যাল কণার অস্তিত্বের কথা কল্পনা করলেন বিজ্ঞানীদ্বয়। কাল্পনিক কণাটির নাম গ্র্যাভিটন।স্ট্রিং থিওরি মতে, একটা বস্তু আরেকটাকে আকর্ষণ করে এই কণাদের (গ্র্যাভিটন) আন্তঃবিনিময়ের মাধ্যমে। স্ট্রিং তত্ত্ব আবিস্কারের ইতিকথা
গত বিংশ শতাব্দির ষাটের দশক। সার্ণে তখন সাইক্লোটন যন্ত্রে কণা
চূর্ণকরণের মহোৎসব। যুক্তরাষ্ট্রের ফার্মি ল্যাবের মতো গড়ে উঠে ইউরোপে সার্ণ । শক্তিশালী
পারমাণবিক বল নিয়ে বেশ ধাঁধাঁয় পড়ে যান বিজ্ঞানীরা। এর মধ্যে ছিলেন ইতালিয়ান ২৬ বছর
বয়সের তরুণ বিজ্ঞানী গ্যাব্রিয়েল ভেনিজিয়ানোও। গ্যাব্রিয়েল বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের
কণাচূর্ণকারী দেশ থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে প্রাপ্ত উপাত্তের সাথে বিটা ফাংশনের
মতো পুরোনো তত্ত্বের মিল খোঁজার জন্য ব্যস্ত সমস্ত হয়ে পড়েন এবং ১৯৬৮ সালে ইউরেকা
ইউরেকা বলে মিল খুঁজেও পান যা সবল নিউক্লিয় বলে (ফোর্সে) মিথস্ক্রিয়া করা কণাগুলোর
ধর্ম চমৎকারভাবে বর্ণনা করতে পারছিল । প্রায় ২০০ বছর পূর্বে বিখ্যাত সুইচ গণিতবিদ লিওনার্দো
অয়েলার বিটা ফাংশনের এই সূত্রটি আবিস্কার করেছিলেন। সূত্রটির বৈজ্ঞানিক নামঃ অয়েলারের
বিটা ফাংশন। শুধু তাই নয়, ভেনিজিয়ানো ওই বছরের (১৯৬৮) সেপ্টেম্বর মাসে ইতালির বিজ্ঞান
জার্নাল ইল নোভো সিমেন্টো-তে এ বিষয়ে এক গবেষণাপত্রও প্রকাশ করেন। গবেষণাপত্রটি
পড়ে সে সময় বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানী হুমড়ি খেয়ে পড়েন ভেনিজিয়ানোর সূত্রের রহস্য উদঘাটনে।
খ্যাতনামা বিজ্ঞানীদের মধ্যে ছিলেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউচিরো নামবু, নীলস বোর
ইনস্টিটিউটের হোগার নীলসেন এবং স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ লিওনার্দো
সাসকিন্ড। তাঁরা শুধু ভেনিজিয়ানোর গবেষণার সাথে একাত্মবোধ করেন নি অধিকন্তু এই তত্ত্বে
সংস্কারও আনেন। বিজ্ঞানীত্রয় সর্বসম্মতভাবে বললেন যে, তাঁরা এতকাল কণাকে (পার্টিকেল)
যেভাবে পয়েন্ট বা বিন্দুর মতো দেখে এসেছেন, মৌলিক কণা আসলে সে রকম নয়; এ গুলি অনেকটা স্ট্রিং অর্থাৎ তার (ওয়্যার) বা সুতার (কটন) মতো লম্বাটে।
তাঁদের ভাষ্য হচ্ছেঃ দুটি কণার মধ্যে সবল নিউক্লিয় বলে (শক্তিশালী পারমাণবিক বল) যদি
অতিক্ষুদ্র, চরম পাতলা এবং প্রায় রাবার ব্রান্ডের মতো সুতা আছে বলে ভাবা যায়, সেটা
যদি ওই কণাদ্বয়কে সংযুক্ত করে, তাহলেই কেবল অয়েলারের সূত্র ব্যবহার করে গাণিতিকভাবে
ওই কোয়ান্টাম প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করা সম্ভব।
এই সুতাগুলো একমাত্রায়
থাকে। সেগুলো ঠিক রাবারের মতো প্রসারিত হতে পারে, পারে সংকুচিত হতেও। অর্থাৎ রাবার
ব্রান্ডের মতই এই সুতাগুলো শক্তি অর্জন করলে প্রসারিত হয়, শক্তি হারালে সংকুচিত হয়।
পাশাপাশি এই স্ট্রিং বা সুতাগুলি থাকে সদা কম্পমান।
অতি আগ্রহী হয়ে স্ট্রিং
সম্পর্কে এই সরল তত্ত্বের স্বীকৃতির আশায় লিওনার্দো সাসকিন্ড সেকালের খ্যাতনামা গবেষণা
জার্নাল ফিজিক্যাল রিভিউ লেটারস-এ এক গবেষণাপত্র লেখেন। বিজ্ঞানীরা সাধারণত আইনস্টাইনের
মতো কল্পনার উপর ভিত্তি করে অনেকটা অনুপ্রাণিত হয়ে গবেষণা কর্মে নিমগ্ন হন। জার্নাল
কর্তৃপক্ষও সাসকিন্ডের গবেষণার অনুরূপ মূল্যায়ন করতে গিয়ে তা প্রকাশে অনীহা প্রকাশ
করে বসেন। এতে চরমভাবে হতাশ হন সাসকিন্ড। ফলে স্ট্রিং থিওরির যে জোয়ার তাতে দ্রুত
ভাটা নেমে আসে। শুধু তাই নয়; যখন দেখা গেল অতিপারমাণবিক কণাদের উচ্চশক্তির পরীক্ষাগুলোর
ফলাফলের সঙ্গে সাসকিন্ডের প্রস্তাবিত তত্ত্ব মোটেও খাপ খাচ্ছেনা বরং অনেক ক্ষেত্রে
যেহেতু গাণিতিক ভবিষ্যদ্বাণী প্রাপ্ত পরীক্ষার ফলাফলের সঙ্গে রীতিমতো সাংঘর্ষিক; তখন তা পরিত্যাজ্য হওয়াটাই
যেন স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়।
তাছাড়া, সে সময় অতিপারমাণবিক
কণাদের শক্তিশালী নিউক্লিয় বলের
ব্যাখ্যায় গড়ে উঠেছিল কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডাইনামিক্স নামে আরেকটি যুগান্তকরি তত্ত্ব।
তত্ত্বটি বেশ ভালোভাবেই প্রকৃতির
প্রায় সব কিছুর গাণিতিক ব্যাখ্যা ও ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারছিল। এভাবে স্ট্রিং থিওরির
প্রতিস্থাপক রূপে প্রতিষ্ঠা লাভ করে উক্ত কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডাইনামিক্স। এতে স্ট্রিং
তত্ত্বে অন্ধকার নেমে এলো আরেকবার।
স্ট্রিং থিওরির এহেন অন্ধকারাচ্ছন্ন
অবস্থায় আশার আলো হয়ে আবির্ভূত হন মার্কিন বিজ্ঞানী জন হেনরি শোয়ার্জ। শোয়ার্জ দেখলেন,
প্রায় বাতিল হয়ে যাওয়া স্ট্রিংয়ের মধ্যে গভীর এক তত্ত্ব লুকিয়ে আছে। তাই তিনি নিরলসভাবে
কয়েকটি বছর রাত-দিন এক করে স্ট্রিং গবেষণায় ডুবে যান। ভাবতে থাকে স্ট্রিংয়ের বিভিন্ন
গাণিতিক দিক নিয়ে। হিসাব কষেন পাতার পর পাতা। এসময় তার গবেষণা সহকর্মী হয়ে আবির্ভূত
হন একে একে স্ট্রিং তাত্ত্বিক পদার্থ বিজ্ঞানী অ্যান্ড্রু নেভ্যু, মাইকেল গ্রিন, জোয়েল
শার্কসহ আরও অনেকে। তাঁরা এ থিওরির কিছু অসঙ্গতিও সনাক্ত করতে সমর্থ হন। স্ট্রিংয়ের
এই অসঙ্গতি দূর করতে তাঁরা আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা এবং কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সাথে খাপ
খাওয়ানোর জোর চেষ্টারত হন। বছর কয়েক প্রচেষ্টার ফলে প্রথমবারের মতো স্ট্রিং তাত্ত্বিকরা
সার্বিক একীভূতকরণ তত্ত্বের আলোকে স্ট্রিং-কে যুগপৎ আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা এবং ম্যাক্স
প্ল্যাঙ্কের কোয়ান্টাম বলবিদ্যার একীভূত করতে সমর্থ হন। স্ট্রিংয়ের এই সাফল্য যুগান্তকরি
বটে। তবে এ সাফল্যের স্বীকৃতির জন্য কঠিন কয়েকটি শর্তরোপ করা হয় যাতে স্ট্রিং আবারও
চ্যালেন্জ পতিত হয়। শর্ত গুলি নিম্নরূপঃ
১) প্রথমতঃ মহাবিশ্বের মাত্রা হতে হবে চতুর্মাত্রিক নয় অন্ততঃ
২৬ মাত্রিক। এর মধ্যে স্থানিক মাত্রা ২৫টি বাকী ১টি সময় মাত্রিক;
২) দ্বিতীয়তঃ এমন এক কণা থাকতে হবে যা আলোর চাইতেও দ্রুতগামী,
যার নামও দেয়া হয় ট্যাকিয়ন এবং
৩) তৃতীয়তঃ ফোটনের ন্যায় ভরবিহীন কিছু কণার অস্তিত্ব থাকতে হবে
যা হবে সদা কম্পমান বা অস্থির।
শর্তগুলো বিনা মেঘে বজ্রপাত
সদৃশ্য মনে হলো স্ট্রিং বিদদের। ফলে আরেকবার হতাশ হতে হলো স্ট্রি তাত্ত্বিকদের।
স্ট্রিং থিওরির আলোকে আইনস্টাইনের একীভূত ক্ষেত্রতত্ত্ব (Unified Field Theory)
৩০ বছরের বেশি সময় ধরে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের জগতে স্ট্রিং তত্ত্ব এমন এক
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে যাতে রয়েছে আলবার্ট আইনস্টাইনের চার চার দশক
ব্যাপী সার্বিক একীভূত ক্ষেত্রতত্ত্বের (unified field theory) উজ্জ্বল সম্ভাবনা।
প্রণয়নের যত ধরনের প্রচেষ্টা হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি
সফল হওয়ার সম্ভাবনা রাখে এই তত্ত্ব। হয়তোবা এ কারণেও পদার্থবিজ্ঞানে একদম হাতেখড়ি হয়েছে
এমন শিক্ষার্থীরাও স্ট্রিং তত্ত্ব সম্পর্কে আগ্রহী। আসলেই কি এর কোনো সত্যিকারের অর্জন
আছে, নাকি এর সব অর্জন ‘মিডিয়ার সৃষ্টি’? এই প্রশ্নের উত্তর নিরপেক্ষভাবে বের করতে
হলে আমাদের এই তত্ত্বের ব্যুত্পত্তির দিকে তাকাতে হবে। (https://www.bigganchinta.com/পদার্থবিজ্ঞান-50)
আইনস্টাইনের আগে বিজ্ঞানীরা ভাবতেন মহাবিশ্ব ত্রিমাত্রিক। অর্থাৎ,
আমরা যা-ই দেখি বা ধরতে পারি, তা পারি তিনমাত্রার মধ্যে থেকে। সামনে-পিছে, পাশাপাশি
এবং ওপর-নিচে। এই তিনমাত্রার মধ্যেই বস্তুর চলাচল। বর্তমানে আমরা যাকে ‘স্থানিক’ মাত্রা
বলি, তার বাইরে অন্য কোনো মাত্রা তাদের চিন্তায় ছিল না। (https://www.bigganchinta.com/books/g47djaq86j)
স্ট্রিং তত্ত্বঃ মহাকর্ষ বলের কোয়ান্টাম ব্যাখ্যার একটি সফল প্রয়াস!
আমরা বর্তমানে স্ট্রিং
তত্ত্বকে মহাকর্ষ বলের কোয়ান্টাম ব্যাখ্যার একটি প্রয়াস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে
স্ট্রিং থিওরির শুরু হয়েছিল সবল কেন্দ্রীণ (strong nuclear) বলের একটি মডেল হিসেবে।
বিজ্ঞানীরা ১৯৫০-এর দশকে দেখতে পেলেন প্রোটন অথবা নিউট্রনের সঙ্গে পাই মেসনের বিক্রিয়ায়
অনেক অনুনাদ (resonance) কণার উত্পত্তি হয়, যারা খুবই ক্ষণস্থায়ী। আরও দেখা গেল, শক্তির
মান বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এ রকম নতুন নতুন *অনুনাদ কণা আবিষ্কৃত হচ্ছে তো হচ্ছেই। যেন
এর শেষ নেই। **কোনো বস্তুর ওপর প্রযুক্ত পর্যাবৃত্ত বলের কম্পাঙ্ক ওই বস্তুর মুক্ত
কম্পনের কম্পাঙ্কের সমান হলে বস্তুটি অতি অল্প সময়ের মধ্যেই প্রবলভাবে কম্পিত হতে
থাকে। এ ঘটনাকে অনুনাদ বলা হয়।(https://www.google.com/search?client=firefox-b-d&q=অনুনাদ+কণা)।
তবে এসব অনুনাদ কণার অস্তিত্ব
বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত কোয়ার্ক নকশার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা গেলেও ওই সময়ে এই ক্রমবর্ধমান
অনুনাদ কণাগুলোর ব্যাখ্যা দিতেই স্ট্রিং তত্ত্বের আবির্ভাব ঘটে।
একটিমাত্র তারের অনেকগুলো
কম্পাঙ্ক থাকে আর এই ভিন্ন ভিন্ন কম্পাঙ্কের সংখ্যা অসীম। বিজ্ঞানীরা এই (সবল) কেন্দ্রীণ
মিথস্ক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী হ্যাড্রন নামে খ্যাত কণাগুলোকেও একটি মৌলিক তার বা সুতার
ভিন্ন ভিন্ন উত্তেজিত অবস্থা (excited state) হিসেবে ব্যাখ্যা করতে চাইলেন। এই তত্ত্বের
শুধু একটি প্যারামিটার (parameter) আছে। আর সেটা হচ্ছে তারের টান (tension)। সবল কেন্দ্রীণ
বলের ধর্ম ব্যাখ্যার জন্য এই টানের মান ১০৯ ইলেকট্রনভোল্ট হওয়া প্রয়োজন। ((https://www.bigganchinta.com/পদার্থবিজ্ঞান-50)
এদিকে আমরা যত মৌলিক কণা
দেখতে পাই সেগুলোকে তাদের স্পিন কোয়ান্টাম সংখ্যার মান অনুসারে বোসন ও ফার্মিয়ন—এই দুই শ্রেণিতে ভাগ করা
যায়। আলোচ্য স্ট্রিং তত্ত্ব শুধু বোসন কণার
ভবিষ্যদ্বাণী করে। তবে এর দ্বারা আমাদের দেখা কোনো ফার্মিয়ন কণার ব্যাখ্যা দেওয়া যায়
না। এ জন্য এ ধরনের স্ট্রিং তত্ত্বকে বোসোনীয় স্ট্রিং তত্ত্ব বলা হয়ে থাকে।
স্ট্রিং তত্ত্বে হতাশার অন্ধকার!
স্ট্রিং দুই প্রকার হতে
পারে: খোলা বা বন্ধ। স্ট্রিংয়ের বিবর্তনে রয়েছে
একটি দ্বিমাত্রিক পৃষ্ঠ (surface )। খোলা স্ট্রিংয়ের জন্য পৃষ্ঠটি হবে অনেকটা চাদরের
মতো, আর বন্ধ স্ট্রিংয়ের জন্য পৃষ্ঠটি হবে একটি নলের মতো।
কিন্তু এই ব্যাখ্যা কিছু
কিছু ক্ষেত্রে কাজ করলেও একটা জায়গায় গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। কোয়ান্টাম বলবিদ্যার
নিয়মানুসারে এই তারের বিভিন্ন দশার মাঝে একটা দশা পাওয়া গেল, যেটা একটা ভরহীন কণা হিসেবে
দেখা দেবে (যেমন: আলোর কোয়ান্টা কণা ফোটন), কিন্তু তার স্পিন কোয়ান্টাম সংখ্যা হবে
২। এ রকম অবস্থা কোনো হ্যাড্রন পরীক্ষাগারে দেখা যায় না। এ জন্য যাঁরা তার বা স্ট্রিংয়ের
মাধ্যমে সবল কেন্দ্রীণ বল ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছিলেন, তাঁরা একটু দমে গেলেন। একই
সময়ে কোয়ার্কের ধারণা প্রচলিত হওয়ার কারণে অনেকেই এই ধাঁচের স্ট্রিং তত্ত্ব নিয়ে কাজ
বন্ধ করে দেন। এতে স্ট্রিং থিওরিতে নেমে আসে চরম হতাশার অন্ধকার।
স্ট্রিং তত্ত্বে আশার আলো!
তারপরও কিছু নিবেদিতপ্রাণ
বিজ্ঞানী এই তত্ত্বের ওপর কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন। অবশেষে ১৯৭৪ সালে জন শোয়ার্জ ও জোয়েল
শার্ক মিলে এবং আলাদাভাবে তামিয়াকি ইয়োনেয়া দেখালেন, তারের টান ১০৯ ইলেকট্রনভোল্ট -এর পরিবর্তে ১০১৯ ইলেকট্রনভোল্ট
হলে স্পিন কোয়ান্টাম সংখ্যা ২-বিশিষ্ট এই অস্বাভাবিক ভরহীন কণাটিকে মহাকর্ষের কোয়ান্টাম
কণা গ্রাভিটন কণা হিসেবে বিবেচনা করা যায়। কারণ, এটি সাধারণ আপেক্ষিকতার আইনস্টাইনের
সমীকরণ মেনে চলে। তাঁদের এই আবিষ্কার স্ট্রিং তত্ত্বকে শুধু নিশ্চিত অপমৃত্যুর হাত
থেকে রক্ষাই করেনি, বরং এর মাধ্যমে স্ট্রিং তত্ত্ব এক লাফে মহাকর্ষের সঠিক কোয়ান্টাম
তত্ত্বের দাবিদার হিসেবে বিবেচিত হতে থাকল। এর পাশাপাশি বিজ্ঞানীরা দেখতে পেলেন, স্ট্রিংয়ের
সুষ্ঠু কোয়ান্টাম তত্ত্ব প্রণয়নের জন্য স্থানকালের মাত্রার সংখ্যা (তত্ত্বভেদে) ২৬
অথবা ১০ হওয়া প্রয়োজন। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি ত্রুটি মনে হলেও, এটা আসলে একটি শাপে
বর।
উল্লেখ্য, ১৯১৯ সালে বিশিষ্ট
পদার্থ বিজ্ঞানী থিওডর কালুজা দেখালেন, পঞ্চমাত্রিক জগতের জন্য লেখা আইনস্টাইনের তত্ত্বকে
যদি চতুর্মাত্রিক জগতে প্রক্ষেপণ (Projection) করা হয়, তবে তার মাঝে ম্যাক্সওয়েলের
তড়িচ্চুম্বক সমীকরণগুলোও লুকিয়ে থাকে। এটা একীভূত ক্ষেত্রতত্ত্ব প্রণয়ন করার দিকে একটি
ফলপ্রসূ পদক্ষেপ। তার মানে চারের বেশি মাত্রার জগতে স্ট্রিং তত্ত্ব প্রণীত হওয়ার কারণে
এই তত্ত্ব আমাদের জগতে মহাকর্ষের পাশাপাশি অন্যান্য মৌলিক বলের উপস্থিতি ব্যাখ্যা করে।
স্ট্রিং তত্ত্বঃ বুঝা এবং বুঝানো সহজ নাকি কঠিন?
জাগতিক অনেক বিষয় রয়েছে
যার অনুধাবন কারও জন্য সহজ, কারো জন্য কঠিন। কথিত আছে যে, একবার আইনস্টাইনের এক ভৃত্য
বাজারে গিয়ে পণ্য দ্রব্য কিনতে গিয়ে হিসাব বিড়ম্বনায় পড়ায় বাসায় ফিরতে কিছুটা বিলম্ব
হওয়ায় আইনস্টাইন কর্তৃক জিজ্ঞাসিত হলে ভৃত্য ঘটনাটি খুলে বলতে না বলতে আইনস্টাইন কাগজ-কলম
নিয়ে ব্যাপারটির গাণিতিক সমীকরণের গভীরে ডুবে গিয়ে অনেকক্ষণ পর তার সমাধান পেয়ে তা
ভৃত্যকে তা জানালে ভৃত্য বললেন, এ সমাধান তো মনে মনে আমি বাজারেই কষেছিলাম এবং সেমতেই
দোকানদারকে পাওনা মিটিয়ে দিয়ে এসেছি।
স্ট্রিং থিওরিও মনে হয় এমন একটা বিষয় যার যেমন সহজবোধ্যতা রয়েছে তেমনি জটিল সমীকরণের মারপ্যাচের কঠিনবোধ্যতাও রয়েছে। যারা নিউটন পন্থী (নিউটনের মতেঃ সত্য দূরে নয় কাছে) তাদের মতে, স্ট্রিংকে বুঝতে হলে (মশার মতো) কামান দাগানোর প্রয়োজন নেই, পক্ষান্তরে আইনস্টাইন পন্থী কারো কারো মতে, প্রয়োজন আছে।
এমতাবস্থায়, সহজ এবং কঠিন- উভয় প্রকারে স্ট্রিং বিশ্লেষণের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিম্নে পেশ করছিঃ
মশক তত্ত্বের আলোকে স্ট্রিং তত্ত্বঃ
মশা অতি ক্ষুদ্রাকৃতি এবং
নরম তুলতুলে প্রাণী যাদের এক থাপড়ে মুহুর্তের মধ্যে অনেকগুলির দফারফা করা সম্ভব। তবে
তার থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য অবশ্যই পারিবারিক বাজেটে একটা আর্থিক বরাদ্দ রাখতে হয় মশারি
ক্রয় খাতে। মরণঘাতি জীবানু বহন করায় সরকারীভাবে সর্বাত্মক উপায়ে মশক নিস্কৃতিমূলক জরুরী
পদক্ষেপ নেয়া হয়। সর্বোচ্চ পদক্ষেপ হিসাবে নেয়া হয় মশক আবাসস্থলে বিমান হামলা। ২০২০
সালে যখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ভাইরাস বিশেষজ্ঞরা করোনা নিয়ে চিন্তিত তখন বিল
গেটস চিন্তিত ছিল আফ্রিকায় ম্যালেরিয়া বিস্তারকারী মশককূল নিয়ে। তবে মশা যে কেবল মানব
জাতির মাথা ব্যথার কারণ তা সর্বাংশে সঠিক নয়। বৈজ্ঞানিক গবেষণাগারে মশার একটি যোগ্য
মর্যাদা রয়েছে। এক গবেষণায় জানা গেছে, সব জাতের মশা অহিতকর নয়। সব মশাই রক্ত শোষক
নয়, কেবন প্রজননক্ষম স্ত্রী মশকরাই কেবল রক্তভূক। পুরুষ মশক নয়। তবে স্ট্রিং তত্ত্ব
সহজে বোঝার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ উভয় মশারই সমান ভূমিকা রয়েছে। ভূমিকাটি নিম্নরূপঃ
যতক্ষণ একটি পুরুষ হোক কিংবা নারী হোক যে কোনো মশা উড়ন্ত নয় ততক্ষণ তা নিরব-নিথর, নিস্ক্রিয় এক খুদে প্রাণী। যখন জাম্বো জেটের মতো সশব্দে কানের কাছে প্রদক্ষিণ করে তখন কামড় দিক বা না দিক, বিদঘুটে আওয়াজ হয় অসহনীয়। যতই বিদঘুটে অআর অসহনীয় হোক না কেন, একজন স্ট্রিং মনস্ক বিজ্ঞানী বা গবেষকের জন্য সহজে স্ট্রিং তত্ত্ব বোঝার জন্য এক চমকপ্রদ সহজ সুযোগ বটে। কারণ, স্ট্রিং প্রমাণের জন্য চাই উচ্চ গ্রামের শব্দ এবং তীব্র কম্পন যা উড়ন্ত মশক বাহিনীর মধ্যে রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১২ সালে ইউরোপীয় পারমাণবিক গবেষণা সংস্থা সার্ণ কর্তৃক কণা বিচূর্ণকারী
সাইক্লোটন যন্ত্র ল্যার্জ হ্যাড্রন কলাইডারে বিলিয়ন বিলিয়ন প্রোটন কণার মুখোমুখি
সংঘর্ষ ঘটিয়ে প্রচন্ড শব্দ, লক্ষ গুণ সৌর কেন্দ্রিক তাপ উৎপন্ন করে সেকেন্ডে ট্রিলিয়ন,
ট্রিলিয়ন কম্পন সৃষ্টি করে হিগস বোসনের কৃত্রিম কণা উৎপন্ন করে যাতে রয়েছে স্ট্রিং
তত্ত্বের বাস্তব প্রমাণ যা প্রাকৃতিকভাবে শব্দ এবং কম্পন সৃষ্টির মাধ্যমে করে থাকে মশাবাহিনী।
স্ট্রিং তত্ত্বের কতিপয় সাফল্য
স্ট্রিং তত্ত্বের
নিম্নোক্ত কতিপয় সাফল্য রয়েছেঃ
ক) দেশ-কালের জন্য
মাত্রা নির্ধারণ (২৬ বা ১০),
খ) গ্র্যাভিটনের
ভবিষ্যদ্বাণী,
গ) অন্যান্য মৌলিক
বলকে এক করা,
ঘ) সুপারসিমেট্রির
মাধ্যমে ফার্মিয়নের ভবিষ্যদ্বাণী করা এবং
ঙ) ব্ল্যাকহোলের
এনট্রপির আণুবীক্ষণিক ব্যাখ্যা
চ) মহাকর্ষ তরঙ্গ
শনাক্ত করা অন্যতম অর্জন।
তবে, এই সাফল্যগুলোর একটিও পরীক্ষাগারে প্রমাণ হয়নি যে, আমরা চার মাত্রার বেশি দেশ-কালে থাকি। তাই এর চেয়ে বেশি মাত্রা বোঝাটা কঠিন। স্ট্রিংয়ের অতিরিক্ত ছয়টি মাত্রার কোনো সরাসরি প্রমাণ মেলেনি। এমনকি ও। মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করা গেছে সত্য। তবে সেটা গ্র্যাভিটনের অস্তিত্বের প্রমাণ হিসেবে দাঁড় করানো যায় না।
সফলতার পথে বোসনিক স্ট্রিং থিওরি
মৌলিক কণাগুলোকে তাদের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। এক শ্রেণির নাম বোসন আর আরেক শ্রেণির নাম ফার্মিয়ন। প্রথম দিকের স্ট্রিং থিওরিকে বলা হতো বোসনিক স্ট্রিং থিওরি। শুরুর দিকে এই স্ট্রিং থিওরিতে শুধু বোসন নিয়েই আলোচনা করত। পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা ভিন্ন ধরনের মৌলিক কণাদের মধ্যে একধরনের তাত্ত্বিক যোগাযোগ বের করেন। এই দুই ভিন্ন ধরনের কণিকাদের মধ্যে এই তাত্ত্বিক সাদৃশ্যের নাম দেওয়া হয় সুপারসিমেট্রি। এরপর এই সুপারসিমেট্রির ধারণাকে স্ট্রিং থিওরিস্টরা তাদের তত্ত্ব গঠনে ব্যবহার করেন। এই নতুন গঠন করা স্ট্রিং থিওরির নাম দেওয়া হয় সুপারস্ট্রিং থিওরি। এখন আর বিজ্ঞানীদের শুধু বোসন নিয়ে পড়ে থাকতে হচ্ছে না। স্ট্রিং থিওরি এখন বোসন ও ফার্মিওন দুই শ্রেণির কণিকাদের আচরণ নিয়েই কাজ করতে পারছে।
CIRNN মনে করে, স্ট্রিংয়ের কম্পন তত্ত্বের কিছুটা প্রমাণ CERN কর্তৃক হিগস বোসন কণা আবিস্কারকালে সাইক্লোটন যন্ত্র LHC-তে পাওয়া গেছে ২০১২ সালে। তবে তা আন্তঃপ্রোটন সংঘর্ষ ঘটিয়ে সেকেন্ডে ট্রিলিয়ন, ট্রিলিয়ন কম্পন সৃষ্টি করে কৃত্রিমভাবে মহাবিশ্বের প্রথম আদিকণার হিগস বোসন উৎপন্নের মধ্য দিয়ে। স্ট্রিংয়ের প্রমাণের জন্য প্রয়োজন আন্তঃ কোয়ার্ক সংঘর্ষ। অবশ্য এতে স্ট্রিং উৎপন্ন হলেও বর্তমান ডিজিটাল প্রযুক্তিতে যে মাত্রার মাইক্রোস্কোপ যন্ত্র রয়েছে তার সর্বোচ্চ মাত্রা ১০-১৭ সেন্টিমিটার। কোয়ার্ক দেখতে লাগছে ১০-১৬ সেন্টিমিটার মাত্রার মাইক্রোস্কোপ। সেক্ষেত্রে স্ট্রিং দেখতে হলে লাগবে কমপক্ষে ১০-৩৩ সেন্টিমিটার মাত্রার মাইক্রোস্কোপ-যা এ মুহুর্তে কল্পনাতীত ব্যাপার।
তবে, CIRNN মনে করে, স্ট্রিংকে দেখতে হবে স্ট্রেন্জ কোয়ার্কের ধারণায় অর্থাৎ না দেখার শর্তে। কারণ, বিজ্ঞানীরা না দেখে কোয়ার্কের জীবন্ত অস্তিত্ব অনুভব করে তার অস্তিত্ব স্বীকার করে নেয়ার ফলে মডার্ণ কসমোলজিক্যাল স্ট্যান্ডার্ড মডেল তত্ত্বের সর্বোচ্চ সফলতা লাভ করে মহাবিশ্বের বস্তুগত গাঠনিক অস্তিত্ব খুঁজে পান কোয়ার্কের মধ্যে। কোয়ার্ককে এই মডেলে বলা হয় মহাবিশ্বের দেওয়াল প্রাচীরের ইট এবং হিগসবোসন কণাকে বলা হয় সেই প্রাচীরের সিমেন্ট রূপে।
স্ট্রিং তত্ত্বের আলোকে সার্বিক একীভূতকরণ তত্ত্বের সমস্যা এবং সম্ভাবনা
স্টিফেন হকিং ব্ল্যাকহোলের এনট্রপির জন্য যে সূত্র বের করেছিলেন স্ট্রিং তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে সেই সূত্রের আণুবীক্ষণিক ব্যাখ্যা করেন কামরান ভাফা ও এন্ড্রু স্ট্রুমিঞ্জার। তাঁদের এই ব্যাখ্যা চার্জযুক্ত এবং ঘূর্ণমান ও চার্জবিশিষ্ট ব্ল্যাকহোলের বেলায় ভালোভাবেই খেটে যায়। তবে শোয়ার্জশিল্ড (schwarzschild) ব্ল্যাকহোল খ্যাত পুরোনো ব্ল্যাকহোলের ক্ষেত্রে এই ভাফা-স্ট্রুমিঞ্জার ব্যাখ্যা অচল। শোয়ার্লিশল্ড ব্ল্যাকহোল হচ্ছে আইনস্টাইনের সাধারণ অআপেক্ষিকতা তত্ত্বের বাস্তব সমীকরণের সমাধান। এর জন্য কোনো আলাদা উৎস লাগে না। এ জন্য এটাকে Vacuum solution বলা হয়। স্ট্রিং থিওরিতে অতিপ্রতিসাম্যের (supersymmetry) উপস্থিতি আছে। তাই সুপারস্ট্রিং তত্ত্বের দেওয়া মাধ্যাকর্ষণের সূত্রগুলোতে বরাবরই মহাকর্ষের পাশাপাশি অতিরিক্ত ক্ষেত্রের (field) উপস্থিতি দেখা যায়। তাই এই তত্ত্ব আইনস্টাইনের দেওয়া মহাকর্ষের তত্ত্ব থেকে বেশ আলাদা। আবার আমাদের চেনা বিশ্বে আইনস্টাইনীয় মহাকর্ষ তত্ত্বই সহজবোধ্য এবং সবচেয়ে কার্যকর।
►“ধরা যাক, ইলেকট্রন বা কোয়ার্কের কথা। এগুলোকে যদি খুব সূক্ষ্ণভাবে দেখা যেতো, তাহলে দেখতাম, আসলে এগুলো কণা বা বিন্দু নয়, সুতার মতো অতি সূক্ষ্ণ তন্তুর কম্পন। সুতার বিভিন্ন মাত্রার কম্পনের ফলে বিভিন্ন কণার সৃষ্টি। ইলেকট্রনের জন্য তন্তুর (সুতার) কম্পনের মাত্রা এক রকম। কোয়ার্কের জন্য তন্তুর কম্পনমাত্রা আরেক রকম। অন্য ১৪টি কণার জন্য তন্তুর আলাদা কম্পন নির্দিষ্ট আছে। তন্তুর কম্পনের মাত্রাই ঠিক করে দেয় কম্পন থেকে সৃষ্ট কণার ভর, চার্জ, স্পিন কেমন হবে। এই বৈশিষ্ট্যগুলোই এক ধরণের কণা আরেক ধরণের কণার মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে। এ সব বিচিত্র কণা দিয়েই গড়ে উঠেছে আমাদের মহাবিশ্ব। এই বিশ্ব তাই সুতায় বোনা মহাবিশ্ব” (বিজ্ঞান চিন্তা)।
মহাকর্ষ কী? এই প্রশ্নের জবাব না ১) নিউটনীয় ক্যালাসিকাল তত্ত্ব পদার্থ ২) না আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব ৩) না ম্যাক্স প্ল্যাংকের কোয়ান্টাম কিংবা ৪) হাইজেবার্গের অনিশ্চয়তা তত্ত্ব তথা পদার্থ বিজ্ঞানে অমীমাংসিত।মহাকর্ষ কীভাবে তৈরি এটাও একটা প্রশ্ন। সির্ণ মনে করে, মহাকর্ষের মূলে পৌঁছতে গেলে অতিপারমাণবিকতার প্রসঙ্গ জরুরী।
প্রত্যেক বিষয় মূলে পৌঁছে (ফারাবী আল আরাবী)। https://www.youtube.com/watch?v=mzuQKQ2Wy3E
1. চর্মচক্ষে আমরা যা দেখি, তা মূল নয়; প্রায় সবই আপেক্ষিক। উদাহরণস্বরূপ, মূল গাছকে জীবিত অবস্থায় যেরূপ দেখি, গাছ কাটার কিছু সময় পর মাটির উপরে গাছ আর গাছ থাকে না, কাঠ হয়ে যায়, দীর্ঘদিন মাটি চাপা পড়লে গাছ কয়লা, পেট্রোল-কেরোসিন, হীরা ইত্যাদিতে রূপান্তরিত হয়ে থাকে। মূল ধানের খোসা ছাড়ালে ধান চাল হয়ে যায়, রান্না করলে ভাত হয়ে যায়। এমনকি সময়ও আপেক্ষিক। সময়ের স্থায়িত্ব উপলদ্ধিকর বিষয়। সময় কারো ক্ষেত্রে দ্রুত, কারো ক্ষেত্রে দীর্ঘ যদিও বাস্তবে প্রত্যেকের জন্যই ৬০ সেকেন্ডে ১ মিনিট, ৬০ মিনিটে ১ ঘন্টা, ২৪ ঘন্টায় ১ দিন, ৭দিনে ১ সপ্তাহ, ১৫ দিনে ১ পক্ষ, ৩৬৫ দিনে ১ বছর, ১২ বছরে ১ যুগ।
আইনস্টাইনের ভরশক্তিমতে মহাকর্ষ অনেকগুলি শক্তির সমাহার। কারণ, এ মতে, জমে থাকা শক্তি জমাটবদ্ধ বস্তুর মতই। যেমন জমে থাকা বরফ জমাট বদ্ধ পানির মতই। কণা বিজ্ঞান তথা জগতের স্থূল বা বৃহদাকার বস্তুর ক্ষেত্রে কণার অবস্থা (পজিশন) আর অতিপারমাণবিকতার (স্ট্রিং তত্ত্বের) ক্ষেত্রে কণার অবস্থাগত যে অভিন্নতা তা হচ্ছে কণার “কম্পন”। তাছাড়া, পারমাণবিকতার ক্ষেত্রে কণার ভিন্নতার কারণ নিউক্লিয়াসে প্রোটনের সংখ্যার তারতম্যতা, রমন ইফেক্টে আলোর প্রতিফলনে ভিন্নতা। পক্ষান্তরে অতিপারমাণবিকতার ক্ষেত্রে স্ট্রিং থিওরিমতে কণার ভিন্নতার কারণ স্ট্রিংয়ের কম্পনের মাত্রার ভিন্নতা।সব তত্ত্বে কম্পনের অভিন্নতা থাকায় বলা যেতে পারে মহাকর্ষও একটি কম্পমান স্ট্রিং তাত্ত্বিক বিষয় বটে।
এখানে স্ট্রিং বা তারকে একমাত্রিক হিসেবে বিবেচিত করা হয়। এই তত্ত্বের উদ্দেশ্য হলো এই তারগুলোর কোয়ান্টাম অবস্থা ও বৈশিষ্ট্যসমূহ ব্যবহার করে মহাবিশ্বের সকল মৌলিক কণা এবং বলের আচরণ ব্যাখ্যা করা। স্ট্রিং থিওরি সকল মৌলিক কণার সাহায্যে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা করতে পারে, ব্যাখ্যা করতে পারে চারটি মৌলিক বল ও সকল প্রকার শক্তিসহ পদার্থের অবস্থা। সেজন্য থিওরি অফ এভ্রিথিং হিসেবে নিজের জায়গা করে নিয়েছে স্ট্রিং থিওরি।
স্ট্রিংয়ের অন্য মাত্রায় যাত্রা
মহাবিশ্বের সকল বল, তত্ত্বকে স্ট্রিং থিওরির আওতায় আনতে গেলে আমাদের চির পরিচিত তিন মাত্রা দিয়ে হয় না। ৪ কিংবা ৫ মাত্রা দিয়েও না। এর জন্য প্রয়োজন হয় অন্ততঃ ১০ টি মাত্রার। এটাই স্ট্রিং থিওরির সীমাবদ্ধতা। আমরা এখনো মাত্রাগুলো বের করতে পারিনি। তবে মাত্রাগুলোর অস্তিত্ব নিয়ে একটি অনুকল্প রয়েছে। আমরা যদি কিছু দূর থেকে একটি তারকে দেখি তাহলে সেটি আমাদের কাছে একমাত্রিক মনে হবে। কিন্তু যদি আমরা কাছে থেকে দেখি তাহলে বুঝতে পারবো যে এটিরও অন্যন্য মাত্রা আছে। হয়তো এই বাকি মাত্রাগুলো এতোই ক্ষুদ্র যে আমরা সেগুলোতে প্রবেশ করতে পারছি না। কিন্তু একটি অতি ক্ষুদ্র জিনিস যেমন কোয়ার্ক বা ইলেকট্রন পারবে।
এসব মাত্রাজনিত এবং পদার্থের বিভিন্ন অসমাপ্ত সমস্যা সমাধানের জন্য বিজ্ঞানীরা তৈরি করেন The Large Hadron Collider, যা সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থিত। এই যন্ত্রে কণার সাথে কণার সংঘর্ষের সৃষ্টি করা হয়। এই যন্ত্রের সাহায্যেই হিগস বোসন কণা প্রমাণিত হয়। স্ট্রিং থিওরির বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে যদি কোন কণার সংঘর্ষ পরবর্তী সময়ের ভর সংঘর্ষের পূর্বের ভরের চেয়ে কম হয় তাহলে বাকি ভর গুলো অন্য মাত্রায় চলে যাওয়ার সম্ভবনা রয়েছে।
এম থিওরি
আগে সবল নিউক্লিয় বলের বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করার জন্য কোয়ান্টাম ক্রোমোডাইনামিক্সের সাহায্য নেওয়া হতো। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এতে উদ্ভূত কিছু সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারছিলেন না। এজন্য ষাটের দশকের শেষ দিকে সবল নিউক্লিয় বলের কিছু বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করার জন্য তারা সম্পূর্ণ নতুন এক তত্ত্ব নিয়ে কাজ করতে থাকেন। পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন এটি নিউক্লিয়ার পদার্থবিদ্যার চাইতে বরং মহাকর্ষের কোয়ান্টাম তত্ত্ব গঠন করতেই বেশি সক্ষম।
পাঁচটি স্ট্রিং থিওরি তৈরি হবার পর বিজ্ঞানীরা দেখলেন যে স্ট্রিং থিওরি কোনো একক তত্ত্বের বদলে একটি একগুচ্ছ তত্ত্বের দিকে যাচ্ছে। এবং একপর্যায়ে ১১ মাত্রা বিশিষ্ট একটি তত্ত্ব গঠন করা হয় যার নাম দেওয়া হয় এম-থিওরি। তাত্ত্বিক পদার্থবিদ (বিশেষ করে স্টিফেন হকিং, এডওয়ার্ড উইটেন এবং জুয়ান ম্যালডাছিনা) মনে করেছিলেন স্ট্রিং থিওরি এমন একটি তত্ত্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যা আমাদের দেখা প্রকৃতির সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারবে। তাদের এরকম মনে করার অবশ্য কারণও আছে। কারণটি হচ্ছেঃ স্ট্রিং থিওরির গাণিতিক গঠনের সাহায্যে কোয়ান্টাম মেকানিক্স ও সাধারণ আপেক্ষিকতাকে একীভূত তত্ত্বে রূপ দেওয়া সম্ভাবনা । মানে আমরা মহাকর্ষের জন্য একটি কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি পাব। ফলে প্রকৃতিতে বিদ্যমান চার প্রকার বলকে একীভূত করার একটা সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
গ্রাভিটি আমাদের হলোগ্রাফিক প্রিন্সিপাল, ব্ল্যাকহোল থার্মোডাইনামিক্সের মতো বেশ কিছু চমৎকার বিষয় সম্পর্কে তত্ত্ব গঠন করতে সহায়তা করছে। স্টিফেন হকিংয়ের মতে, “এম-থিওরিই একমাত্র তত্ত্ব যেটি নিজেকে সবকিছুর তত্ত্ব বলে দাবী করতে পারে।” রির্চাড ফাইনম্যান, রজার পেনরোজ এবং শেলডন লি গ্লাসোর মতো কয়েকজন পদার্থবিজ্ঞানী অবশ্য এর সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে এই তত্ত্ব পরীক্ষার জন্য প্রচুর শক্তির প্রয়োজন এবং তাই পরীক্ষা করে এই তত্ত্বের অনুমানগুলোর সত্যতা প্রমাণ করা সম্ভব না। তাই এই তত্ত্ব নিজেকে সবকিছুর তত্ত্ব হিসেবে দাবী করতে পারে না।
বর্তমানে অসমাধিত তত্ত্বের সংখ্যা অনেক। ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব ব্যাখ্যার জন্য স্ট্রিং থিওরিকে বাস্তবের সাথে মিল রেখে একটি সমীকরণ তৈরি করতে হবে। এছাড়া মহাবিশ্ব সম্প্রসারন ধ্রুবক বের করার জন্যও এটি প্রমাণের প্রয়োজন। তবে এর সীমাবদ্ধতাগুলো জটিল তাই এর বিরোধিতাও করে অনেকেই। এটি মহাবিশ্বের সকল অবস্থার ব্যাখ্যা একসাথে করতে পারে না। স্থান কালের বক্রতার ব্যাখ্যাও স্পষ্ট নয়। থিওরিটি শুধু সমীকরণে প্রমাণ করা সম্ভব হলেও এটি আমাদের মহাবিশ্বকে বোঝার জন্য সুন্দর একটি ধারণা সৃষ্টি করেছে। আজকের প্রযুক্তি হয়তো একে প্রমাণ করতে পারবে না কিন্তু একটা বিশ্বাস বিজ্ঞানীরা করেন যে ভবিষ্যতে এর প্রমাণ সম্ভব হবে আর আমরা মহাবিশ্বের ব্যাখ্যা করতে সম্ভব হবো।
https://www.bigganchinta.com/স্ট্রিং-তত্ত্ব-কি-আসলে-সফলস্ট্রিং-তত্ত্ব-কি-আসলে-সফল
https://m.facebook.com/813426538776849/posts/1197808197005346/?locale=pt_BR
বৈজ্ঞানিক ফর্মূলায় একটি আপেল যেভাবে স্ট্রিংয়ে পরিণত হতে পারে
4. প্রশ্ন জাগতে পারে এই যে, হাতের মধ্যে একখানা আপেল বা অন্য কোনো ফল, মূল কিংবা যে কোনো বস্তু-পদার্থ তা কীভাবে তৈরি? একটু জুম করে দেখলে যা পাওয়া যাবে তার বৈজ্ঞানিক নাম কোষ (সেল), তারপর আরও জুম করলেন। এরপর জুম করতে করতে একপর্যায়ে পাওয়া যাবে অণু (অ্যাটম)। এরপর আরও বিবর্ধিত করলে দেখতে পারবেন পরমাণু (নিউক্লিয়ার)। এখানেই কিন্তু শেষ নয়। ভিতরে আরও খুঁজে পাওয়া যাবে ইলেক্ট্রন ঘুরছে। এতেও হলো না, আরও দেখলে দেখতে পারবো একজায়গায় আরেকটি ক্ষুদ্র জিনিস। নিউক্লিয়াস। যেটি আবার আরও দুইটি জিনিস প্রোটন আর নিউট্রন দিয়ে তৈরি। এই কি শেষ? না। আমরা যদি নিউট্রনকে আবার জুম করে দেখি আমরা পাবো আরও ক্ষুদ্র পদার্থ যার নাম কোয়ার্ক।
স্ট্রিং থিওরি
বলে, যদি আমরা এই কোয়ার্ককে বর্ধিত করি তাহলে পাবো এক শক্তি, যা সুতো বা তারের
মতো।
মনে করি, অতি চিকন শক্ত একটি তার নিই। তারটিকে মনে মনে ৩ ভাগ করি। তারের শুরু বা অগ্র ভাগকে এ, শেষ প্রান্তকে বি-ধরে উভয় প্রান্ত শক্তভাবে টান টান ভাবে বেঁধে নিই। তারের মধ্য ভাগকে মনে করি-সি অংশ। দেখা যাবে তারটি নিরব, নিস্তব্দ অবস্থায় রয়েছে। যদি মধ্য ভাগ সি-তে হালকাভাবে আঙ্গুল দ্বারা নাড়া দিই তাতে মৃদু কম্পনের সাথে মৃদু শব্দ শোনা যাবে। স্ট্রিং থিওরিমতে বস্তুকণা উদ্ভবের জন্য অপরিহার্য শর্ত হচ্ছেঃ তারের কম্পন।
►“এ পর্যন্ত মহাবিশ্বের মূল কণিকার সংখ্যা হলো ১৬। এগুলোর মধ্যে সব ধরণের কোয়ার্ক-ইলেকট্রনসহ ১২টিকে বলে ফার্মিয়ান শ্রেণীর কণা। আলোর ভরশুন্য ফোটন কণাসহ বাকী ৪টিকে বলে বোসন শ্রেণীর কণা। কিন্তু স্ট্রিং তত্ত্ব অনুযায়ী এই ১৬টি কণাই শেষ কথা নয়, বস্তুর আরও ক্ষুদ্রতম অস্তিত্ব রয়েছে, সেটা হলো স্ট্রিং তন্তু। স্ট্রিংয়ের ঘূর্ণনেই বস্তুর কণার সৃষ্টি” (বিজ্ঞান চিন্তা)।
►“ধরা যাক, ইলেকট্রন বা কোয়ার্কের কথা। এগুলোকে যদি খুব সূক্ষ্ণভাবে দেখা যেতো, তাহলে দেখতাম, আসলে এগুলো কণা বা বিন্দু নয়, সুতার মতো অতি সূক্ষ্ণ তন্তুর কম্পন। সুতার বিভিন্ন মাত্রার কম্পনের ফলে বিভিন্ন কণার সৃষ্টি। ইলেকট্রনের জন্য তন্তুর (সুতার) কম্পনের মাত্রা এক রকম। কোয়ার্কের জন্য তন্তুর কম্পনমাত্রা আরেক রকম। অন্য ১৪টি কণার জন্য তন্তুর আলাদা কম্পন নির্দিষ্ট আছে। তন্তুর কম্পনের মাত্রাই ঠিক করে দেয় কম্পন থেকে সৃষ্ট কণার ভর, চার্জ, স্পিন কেমন হবে। এই বৈশিষ্ট্যগুলোই এক ধরণের কণা আরেক ধরণের কণার মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে। এ সব বিচিত্র কণা দিয়েই গড়ে উঠেছে আমাদের মহাবিশ্ব। এই বিশ্ব তাই সুতায় বোনা মহাবিশ্ব” (বিজ্ঞান চিন্তা)।
মহাকর্ষ কী? এই প্রশ্নের জবাব না ১) নিউটনীয় ক্যালাসিকাল তত্ত্ব পদার্থ ২) না আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব ৩) না ম্যাক্স প্ল্যাংকের কোয়ান্টাম কিংবা ৪) হাইজেবার্গের অনিশ্চয়তা তত্ত্ব তথা পদার্থ বিজ্ঞানে অমীমাংসিত।মহাকর্ষ কীভাবে তৈরি এটাও একটা প্রশ্ন। সির্ণ মনে করে, মহাকর্ষের মূলে পৌঁছতে গেলে অতিপারমাণবিকতার প্রসঙ্গ জরুরী।
প্রত্যেক বিষয় মূলে পৌঁছে (ফারাবী আল আরাবী)। https://www.youtube.com/watch?v=mzuQKQ2Wy3E
1. চর্মচক্ষে আমরা যা দেখি, তা মূল নয়; প্রায় সবই আপেক্ষিক। উদাহরণস্বরূপ, মূল গাছকে জীবিত অবস্থায় যেরূপ দেখি, গাছ কাটার কিছু সময় পর মাটির উপরে গাছ আর গাছ থাকে না, কাঠ হয়ে যায়, দীর্ঘদিন মাটি চাপা পড়লে গাছ কয়লা, পেট্রোল-কেরোসিন, হীরা ইত্যাদিতে রূপান্তরিত হয়ে থাকে। মূল ধানের খোসা ছাড়ালে ধান চাল হয়ে যায়, রান্না করলে ভাত হয়ে যায়। এমনকি সময়ও আপেক্ষিক। সময়ের স্থায়িত্ব উপলদ্ধিকর বিষয়। সময় কারো ক্ষেত্রে দ্রুত, কারো ক্ষেত্রে দীর্ঘ যদিও বাস্তবে প্রত্যেকের জন্যই ৬০ সেকেন্ডে ১ মিনিট, ৬০ মিনিটে ১ ঘন্টা, ২৪ ঘন্টায় ১ দিন, ৭দিনে ১ সপ্তাহ, ১৫ দিনে ১ পক্ষ, ৩৬৫ দিনে ১ বছর, ১২ বছরে ১ যুগ।
আইনস্টাইনের ভরশক্তিমতে মহাকর্ষ অনেকগুলি শক্তির সমাহার। কারণ, এ মতে, জমে থাকা শক্তি জমাটবদ্ধ বস্তুর মতই। যেমন জমে থাকা বরফ জমাট বদ্ধ পানির মতই। কণা বিজ্ঞান তথা জগতের স্থূল বা বৃহদাকার বস্তুর ক্ষেত্রে কণার অবস্থা (পজিশন) আর অতিপারমাণবিকতার (স্ট্রিং তত্ত্বের) ক্ষেত্রে কণার অবস্থাগত যে অভিন্নতা তা হচ্ছে কণার “কম্পন”। তাছাড়া, পারমাণবিকতার ক্ষেত্রে কণার ভিন্নতার কারণ নিউক্লিয়াসে প্রোটনের সংখ্যার তারতম্যতা, রমন ইফেক্টে আলোর প্রতিফলনে ভিন্নতা। পক্ষান্তরে অতিপারমাণবিকতার ক্ষেত্রে স্ট্রিং থিওরিমতে কণার ভিন্নতার কারণ স্ট্রিংয়ের কম্পনের মাত্রার ভিন্নতা।সব তত্ত্বে কম্পনের অভিন্নতা থাকায় বলা যেতে পারে মহাকর্ষও একটি কম্পমান স্ট্রিং তাত্ত্বিক বিষয় বটে।
এখানে স্ট্রিং বা তারকে একমাত্রিক হিসেবে বিবেচিত করা হয়। এই তত্ত্বের উদ্দেশ্য হলো এই তারগুলোর কোয়ান্টাম অবস্থা ও বৈশিষ্ট্যসমূহ ব্যবহার করে মহাবিশ্বের সকল মৌলিক কণা এবং বলের আচরণ ব্যাখ্যা করা। স্ট্রিং থিওরি সকল মৌলিক কণার সাহায্যে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা করতে পারে, ব্যাখ্যা করতে পারে চারটি মৌলিক বল ও সকল প্রকার শক্তিসহ পদার্থের অবস্থা। সেজন্য থিওরি অফ এভ্রিথিং হিসেবে নিজের জায়গা করে নিয়েছে স্ট্রিং থিওরি।
১) প্রথম শর্তমতে বলা হয়েছে মহাবিশ্বের মাত্রা হতে হবে অন্ততঃ
২৬ মাত্রিক। এর মধ্যে স্থানিক মাত্রা ২৫টি বাকী ১টি সময়
মাত্রিক।
আমাদের পরিচিত জগৎ মোটামুটি
চতুর্মাত্রিক। সামনে-পেছনে, উপরে-নীচ। বাকী ২২ মাত্রা কোথায় কিভাবে? ট্যাকিয়ন কি?
কেমন? এভাবে উদ্ভট, অভাবনীয় কিছু প্রশ্নে স্ট্রিং এক কঠিন তত্ত্বে নয় কেবল, অনেকটা
হাসির খোরাকে পরিণত হয়।
কথিত আছে, স্ট্রিংবিদ জন
শোয়ার্জের সঙ্গে তৎকালীন খ্যাতনামা বিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যানের যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালটেকে
সিঁড়ি বেয়ে উঠার সময় দেখা হলে স্ট্রিং নিয়ে রীতিমত কৌতুক করে ফাইনম্যান নাকি জিজ্ঞেস
করেছিলেন, আচ্ছা, জন (Jon) আজ তুমি কত মাত্রায় আছ?
শুধু কৌতুকই নয়, স্ট্রিংয়ের
মধ্যে দেখা দেয় আভ্যন্তরীন তাত্ত্বিক সংকটও। সংকটটি হচ্ছে কোয়ার্ক নামের মহাবিশ্বের
বস্তুগত গাঠনিক বিষয়টি স্ট্রিং তত্ত্বে না থাকা। এ কারণেও অনেকের মধ্যে স্ট্রিং সম্পর্কে
অনীহা দেখা দেয়। রাতের পর দিন, দিনের পর রাত,
ভাটার পর যেমন জোয়ার, জোয়ারের পর ভাটা কিংবা দুঃখের পর সুখ, সুখের পর দুঃখ যেমন পর্যায়ক্রমে
(বাই রোটেশনারি) ঘটে তেমনি স্ট্রিং থিওরিতে কখনও আশার আলো, কখনো নিরাশার অন্ধকার
পেরিয়ে সম্ভাবনার দ্বার প্রান্তে পৌঁছে। এভাবে অন্ধকার কাটিয়ে গত শতাব্দীর সত্তর দশকে
স্ট্রিং থিওরি আবার আশার আলো দেখেছিলেন পদার্থবিদ পিয়েরে রেমন্ড। রেমন্ড স্ট্রিং সংক্রান্ত
নতুন সমীকরণ উদ্ভাবন করে বোসন কণার পাশাপাশি ফার্মিয়ান কণার অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছিল।
পিয়েরে রেমন্ড মনে করেন, তত্ত্বটার যদি নতুন একটা সিমেট্রি বা প্রতিসাম্য থাকে, তাহলে
একে সুপারসিমেট্রির মাধ্যমে সংগতিময় বা যুক্তিসংগত করে তোলা সম্ভব । স্ট্রিং সংক্রান্ত
এই সমীকরণকে বলা হয় সুপার সিমেট্রিক স্ট্রিং থিওরি, সংক্ষেপে সুপারস্ট্রিং থিওরি।
প্রায় একই সময়ে স্ট্রিংয়ে
আরেকটা সংস্করণ আবিস্কার করেন অ্যান্ড্রু নেভ্যু এবং জন শোয়ার্জ। তাঁদের সংস্করণে
ট্যাকিয়ন ছিল না। তবে ফার্মিয়ান কণার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। তাছাড়া ২৬ মাত্রা কমে দাঁড়ায়
১০ মাত্রায়। বলা যায় এ হচ্ছে স্ট্রিং তত্ত্বের বড় ধরণের অগ্রগতি যা আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা
এবং ম্যাক্স প্ল্যাংকের কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের সাথে মানানসই ছিল। তবে প্রশ্ন দাঁড়ায়,
আমাদের চেনা বিশ্বের মাত্রা যেখানে ৪ মাত্রিক সেখানে বাকী ৬ মাত্রা কোথায় গেল? এ প্রশ্নের
জবাব রয়েছে স্ট্রিং থিওরিতে। এতে বলা হয় ১০ মাত্রিক বিশ্বে আমরা কেবল ৪ মাত্রা অনুভব
করি। বাকী ৬ মাত্রা অনুভব
বিহীন।
দেখা যাচ্ছে, গত শতাব্দীর
৭০ –এর দশকে স্ট্রিং থিওরির প্রধান কিছু সমস্যা দূর করে ফেলা সম্ভব হলো। তবে একট সমস্যার
সমাধান তখনো বাকি। সমস্যাটা হলো স্ট্রিংয়ের প্রামাণ্যতা স্বরূপ এমন একটি কণা থাকতে
হবে যা ফোটনের মতো ভর শুন্য এবং সদা কম্পমান। গাণিতিক হিসাব কষে নতুন একটি কণা পাওয়া
গেল, তবে তা ভরশুন্য নয়। ব্যাপারটা কী? এখানে হিসাবে গন্ডগোল দেখা দেয়। এই সংকটকালে
একটা বড় ধরণের পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে আসেন জোয়েল শার্ক এবং জন শোয়ার্জ। একটা হাইপোথেটিক্যাল
কণার অস্তিত্বের কথা কল্পনা করলেন বিজ্ঞানীদ্বয়। কাল্পনিক কণাটির নাম গ্র্যাভিটন। (লক্ষ্যনীয় যে, এতে স্ট্রিং জড়িয়ে পড়ে মহাকর্ষ তত্ত্বের দিকে) স্ট্রিং
থিওরি মতে, একটা বস্তু আরেকটাকে আকর্ষণ করে এই কণাদের (গ্র্যাভিটন) আন্তঃবিনিময়ের মাধ্যমে।
এভাবে স্ট্রিং থিওরির বড় একটা সমস্যার সমাধান হলো। একই সঙ্গে সম্ভব হলো মহাকর্ষ বলের
সঙ্গে প্রকৃতির অন্য বলগুলোকে
একীভূত করার কাজটাও। স্ট্রিং থিওরিকে থিওরি অব এভরিথিং বলার এটাও একটা কারণ বটে।
আসলে স্ট্রিং থিওরিতে বেশ
কিছু উদ্ভটতা আছে সত্য, কিন্তু তারপরও পদার্থবিজ্ঞানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠিত
আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এবং ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের কোয়ান্টাম মেকানিকস তত্ত্বকে
দাম্পত্যের আদলে জুটিবদ্ধ করতে পারছে এটি। ফলে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বহুল প্রত্যাশিত
কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটির । এভাবে স্ট্রিং থিওরি প্রাণ ফিরে পেলে ১৯৮০ এর দশকে শত শত
বিজ্ঞানী স্ট্রিং তত্ত্ব নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন নিবিড় গবেষণায় । যাকে বলা হয় সুপারস্ট্রিংয়ের
প্রথম বিপ্লব।
প্রায় এক দশক পর ১৯৯৫ সালে
স্ট্রিং থিওরি আরেকটা রূপান্তরের পথে এগিয়ে যায়। ফলশ্রুতিতে স্ট্রিংয়ে নতুন আরেক ধারণার
উদ্ভব ঘটে। ধারণাটিকে বলা হয় এম-থিওরি বা এম-তত্ব। এই দশকে সম্ভবপর হয় স্ট্রিং থিওরি
থেকে কোয়ান্টাম মহাকর্ষের ৫টি আলাদা সংস্করণ লাভের- যার প্রতিটিই সসীম এবং সুসংজ্ঞায়িত।
পাঁচ প্রকারের স্ট্রি থিওরি দেখতে প্রায় একই রকম। শুধু স্পিনের বিন্যাস কিছটা ভিন্ন।
স্ট্রিং ৫ প্রকার কেন? এ প্রশ্নের জবাবে পদার্থ বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড উইটেন বলেনঃ আসলে
একটা গুপ্ত এগারো-মাত্রিক তত্ত্ব আছে, যার ভিত্তি মেমব্রেন বা পর্দা, শুধু স্ট্রিং
নয়। এ তত্ত্বকে বলা হয় এম-তত্ত্ব। উইটেন তাঁর ব্যাখ্যায় বলেনঃ ৫ প্রকারের কারণ হচ্ছে,
একটা এগারো মাত্রিক পর্দা দশ মাত্রিক স্ট্রিংয়ে চুপসে যাওয়ার পাঁচটি উপায় আছে। অন্য
কথায় স্ট্রিং থিওরির পাঁচ সংস্করণের সব কয়টি আসলে একই এম-তত্ত্বের ভিন্ন ভিন্ন গাণিতিক
প্রকাশ মাত্র। কাজেই স্ট্রিং থিওরি আর এম-থিওরি আসলে একই তত্ত্ব। পার্থক্য শুধু, স্ট্রিং
থিওরি এগারো মাত্রিক এম-তত্ত্বের দশ মাত্রায় সংকুচিত রূপ। এই হলো স্ট্রিং থিওরির তাত্ত্বিক কথা।
স্ট্রিং থিওরি মতে, কণা
নয়, বস্তুজগতের মৌলিক একক আসলে স্ট্রিং বা তার বা সুতার মতো কিছু একটা। এই সুতার আকার
একটা পরমাণুর নিউক্লিয়াসের চেয়েও কোটি কোটি কোটি....ভাগ ছোট। প্রায় ১০-৩৩
সেন্টিমিটার। এটা বিভিন্নভাবে কাঁপতে পারে। এই কাঁপার ধরণের উপর নির্ভর করে গড়ে
উঠে কোয়ার্ক-ইলেকট্রনের মতো মহাবিশ্বের বস্তুগত দৈহিক অবকাঠামোর মূল ভিন্ন ভিন্ন
উপাদানগুলো।
তারপরও স্ট্রিং থিওরিকে
একেবারে নিখুঁত বলা যায় না। এর সবচেয়ে বড় দূর্বলতা হলো তত্ত্বটা পরীক্ষা করে দেখা
সম্ভব হয়নি। কাল্পনিক কণা গ্র্যাভিটন বা সুপার সিমেট্রির মাধ্যমে পাওয়া সুপার পার্টনার
কণার অস্তিত্ব এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই কণা যে শক্তি ধারণ করে তাকে বলা হয় প্ল্যাঙ্ক
এনার্জি। সেটা আমাদের এখন পর্যন্ত তৈরি করা সবচেয়ে বড় কণা চূর্ণ-বিচূর্ণকারী সাইক্লোটন
যন্ত্র “ল্যার্জ হ্যাড্রন কলাইডার” বা এলএইচসি এর চাইতে কোয়াড্রিলিয়ন গুণ বেশি।
স্ট্রিং-কে নিখুঁতভাবে
জানতে হলে সার্ণের বর্তমানে ২৭ মাইল পরিধি
বিশিষ্ট এলএইচসির যে আকার তার চাইতে কোয়াড্রিলিয়ন গুণ বড় আরেকটা এলএইচসি বানানোর
চেষ্টা করতে হবে। এতে লাগবে বিশালাকৃতির পার্টিকেল অ্যাকসিলারেটরের-যার আকার-আয়তন হতে
হবে একটা আস্ত গ্যালাক্সির সমান। তাছাড়া স্ট্রিং থিওরির যে একাধিক মাত্রা, প্রতিটি
মাত্রাকে বুঝতে হলে লাগবে একেকটা মহাবিশ্ব। এজন্য বিজ্ঞানীদের জন্য এমন ল্যাবরেটরী
গড়তে হবে- যার আকার হতে হবে ছোটখাটে মহাবিশ্বের আয়তনের। ব্যাপারটা অনেকটা আকাশ-কুসুম কল্পনা!
স্ট্রিং থিওরিতে মহাবিশ্বের মাত্রাজ্ঞানঃ নতুন বিশ্বে
নতুন বিজ্ঞানের পদধ্বনি!
মহাবিশ্বটা বড়। অ-নে-ক বড়। ধারণা করা হচ্ছে, মহাবিশ্বের যেকোনো
দিকে তাকালে আমরা বড়জোর সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৬০০ কোটি আলোকবর্ষ বা (১,৮৬,০০০x৬০ x ৬০
x২৪ x৩৬৫)বৎসর। সে হিসাবে ১,৮৬,০০০x৬০ x ৬০ x২৪ x৩৬৫ x৪,৬০০০ x১,০০০০০০০০ মাইল দূর
পর্যন্ত দেখতে পাই। অর্থাৎ মহাবিশ্বের এই পরিমাণ মাইলেজ দূরত্বের আলো পৃথিবীতে পৌঁছতে
সময় লেগেছে কমপক্ষে ১ হাজার ৩৮০ কোটি বছর। এ ধারণাকে বলা যেতে পারে বৈজ্ঞানিক হাইপোথিসি।
কারণ প্রকৃতপক্ষে মহাবিশ্বের শেষ সীমানা কোথায় তার হদিস হাবল টেলিস্কোপে পাওয়া যায়
নি, জেমস ওয়েবেও এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তাই মহাবিশ্বের বিশালতার গাণিতিক এই হিসাবটাও
নিছক জ্যোতির্বিদদের অনুমান মাত্র। অন্তত আমাদের পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বটা কত বড়,
তা–ও কেউই সঠিক বলতে পারবে না।
১৯২০ সালের আগ পর্যন্ত নিউটন, আইনস্টাইনসহ জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের
বিশ্বাস ছিল মহা বিশ্ব স্থির। অআইনস্টাইন এই বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে রচনা করেছিলেন
বিশেষ অআপেক্ষিকতা তত্ত্ব। কিন্ত্ত এ ধারণায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন জ্যোতির্বিজ্ঞান
হাবল। ১৯২০ সালে স্থাপিত হাবল নামক তৎকালীন সর্ববৃহৎ টেলিস্কোপের মাধ্যমে জানতে পারেন
যে, মহাবিশ্ব দ্রুত গতিতে প্রসারিত হচ্ছে।
মডার্ণ কসমোলজিক্যাল স্ট্যান্ডার্ড মডেল মতে, বিগ ব্যাংয়ের মাধ্যমে
মহাবিশ্বের জন্ম। সেই থেকে বড় হচ্ছে মহাবিশ্ব। পাশাপাশি ক্রমেই বাড়ছে এর প্রসারণের
বেগও । কিন্তু আসলে কত জোরে বড় হচ্ছে মহাবিশ্ব? এই একটি প্রশ্নের সঠিক উত্তর বলে দেবে
মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের এত দিনের ধারণা ভুল কি ঠিক।
তবু একটি ভালো অনুমান পেতে বিজ্ঞানীরা মরিয়া। যে প্রচেষ্টারই এক
হাতিয়ার হাবল ধ্রুবক। মহাবিশ্ব কত জোরে প্রসারিত হচ্ছে, তারই পরিমাপক এই সংখ্যা। মহাবিশ্বের
আকার ও বয়স দুটোই সঠিকভাবে জানতে হলে এই ধ্রুবক জানার জন্য হাবল কিংবা জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের
বিকল্প নেই। কিন্ত্ত মহাবিশ্ব কিভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছে? সম্প্রসারণের বিষয়টা অনেকটা
বেলুনের মত।
উদাহরণস্বরূপ, একটি বেলুন ফুলতে থাকলে যেমন অবস্থা হবে, তার সঙ্গে
কিছুটা মিল আছে মহাবিশ্বের। ছায়াপথ ও নক্ষত্রগুলো হলো বেলুনের গায়ের বিন্দুর মতো। সব
কটি বিন্দু একে অপর থেকে দূরে সরছে। যেগুলোর পারস্পরিক দূরত্ব বেশি, সেগুলো তত বেশি
জোরে সরছে। তার মানে, আমাদের থেকে যে ছায়াপথ যত বেশি দূরে, সেটি এত দ্রুত দূরে হারিয়ে
যাচ্ছে।
কিন্তু হাবল ধ্রুবক যেন এক সোনার হরিণ। বিজ্ঞানীরা এর দ্বারা যতই
একে মাপেন, ততই এটি মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে দিচ্ছে। একভাবে
মেপে একটি মান পাওয়া গেল তো আরেকভাবে মাপলে পাওয়া যাচ্ছে অন্য একটি মান।
এই দুই মান একমত না হওয়ার অর্থ কী? হয় পরিমাপ করতে ভুল হচ্ছে,
নয়তো মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণায় গন্ডগোল আছে।(সূত্রঃ বিজ্ঞানচিন্তা...)।
মহাবিশ্বের আদিম অবস্থায়
দুটি বলের টানাটানি চলছিল। একটি মহাকর্ষ, যা মহাবিশ্বকে গুটিয়ে রাখতে চাইছিল। আরেকটি
বিকিরণের বহির্মুখী চাপ। এই দুই বলের ধাক্কাধাক্কির চিহ্ন সিএমবির মানচিত্রের তাপমাত্রার
তারতম্য হিসেবে আজও দেখা যায়। এই তারতম্য থেকে বের করা যেতে পারে, বিগ ব্যাংয়ের ঠিক
পরে মহাবিশ্ব কত জোরে প্রসারিত হচ্ছে।
একটি উপায় হলো মহাবিশ্বকে সরাসরি মাপা। আরেকটি উপায় হলো মহাবিশ্ব
সম্পর্কে আমরা যা জানি, সে জ্ঞানের ভিত্তিতে মান বের করা।
তবে বিজ্ঞানীদের এখন বিশ্বাস, তাঁরা সঠিক মানের খুব কাছে চলে এসেছেন।
এ আত্মবিশ্বাসের কারণ নতুন কিছু পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা। এতে প্রধান একটি অসুবিধা হলো
প্রকৌশলগত দিক। আমাদের যন্ত্রপাতি দিয়ে আমরা কত নিখুঁত ও নির্ভুলভাবে মাপতে পারি, সেটা
খুব গুরুত্বপূর্ণ। এর জন্য শুধু একগাদা উপাত্ত সংগ্রহ করাই যথেষ্ট নয়। পরিমাপ পদ্ধতির
নির্ভুলতা সম্ভব সর্বোচ্চ উপায়ে যাচাই করতে হবে।
ধ্রুবকটি প্রথম মাপেন হাবল নিজে, যাঁর
নাম থেকে ধ্রুবকের এই নাম। ১৯২৯ সালে মেপে তিনি এর মান পান প্রতি মেগাপারসেকে প্রতি
সেকেন্ডে ৫০০ কিলোমিটার বা ৩১০ মাইল। এর অর্থ হলো প্রতি ১ মেগাপারসেক দূরের ছায়াপথ
আমাদের থেকে সেকেন্ডে ৫০০ কিলোমিটার বেশি বেগে দূরে সরে যাচ্ছে। ১ পারসেক হলো আলোর
বেগের ৩.২৬ আলোকবর্ষের সমান। আর মেগা হলো তার ১০ লাখ গুণ। ১ মেগাপারসেককে কিলোমিটারে
বুঝতে হলে ৩০৯ লিখে তার ডানে ১৭টি শূন্য বসিয়ে নিন।
গত প্রায় ১০০ বছরে হাবলের পরিমাপকে অনেকবার সংশোধন করা হয়েছে।
প্রাপ্ত মান কমেছে অনেক। বিংশ শতাব্দীর বেশির ভাগ সময়জুড়ে মান ছিল ৫০ থেকে ৯০ এককের
মধ্যে। নব্বইয়ের দশকে মহাবিশ্বের ল্যামডাসিডিএম মডেল ও মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণের পর্যবেক্ষণ
কাজে লাগিয়ে দেখা যায়, ধ্রুবকের মান ৭০-এর কাছাকাছি। ২০১৮ সালে প্ল্যাঙ্ক মিশনের পরিমাপ
বলে, ৬৭.৪৪–এর আশপাশে হবে এই মান। কিন্তু আবার ২০১৯ সালের মার্চে হাবল স্পেস টেলিস্কোপের
মাধ্যমে পরিমাপ করে পাওয়া যায় ৭৪.০৩–এর আশপাশের মান।
উল্লেখ্য, একাধিক নমুনা ব্যবহার করে বের করা এই মানগুলোতে সব সময়
একটু পারিসংখ্যাগত তারতম্য বা অনিশ্চয়তা থাকায় আশপাশের মান বলা হয়ে থাকে। এমতাবস্থায়
সর্বশেষ পরিমাপে ধ্রুবকের মান দাঁড়াচ্ছে ৭৪.০৩ ±১.৪২। তৎপরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানে ধ্রুবকটির
মান ধরা হচ্ছে ৬৭ থেকে ৭৪ । (এডিট ৭/৫/২০২৩, সময়ঃ ৭ঃ০৫)
একটি সমস্যা হলো,
কীভাবে মাপা হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে পাল্টে যায় মান। পরিমাপের একটি উপায় হলো,
কাছের ছায়াপথগুলো আমাদের কাছ থেকে কত দূরে সরে যাচ্ছে, সেটা বের করা। আরেকটি উপায়
হলো, মহাজাগতিক মাইক্রোওয়েভ পটভূমি বা সিএমবি (CMB)। এটা হলো বিগ ব্যাংয়ের
ধ্বংসাবশেষ। জন্মের পর প্রথম যে আলো ছড়িয়ে পড়েছিল মহাবিশ্বে, শক্তি অনেকাংশে কমে
গেলেও সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শন হিসাবে আজও সেই আলো আছে। ১৯৬৫ সালে আকস্মিকভাবে আবিষ্কৃত হয় এ দুর্বল
আলো।
উল্লেখ্য, মহাবিশ্বের
আদিম অবস্থায় মহাকর্ষ এবং বিকিরণের বহির্মুখী চাপ- এই দুটি বলের পরস্পরের মধ্যে টানাটানি চলছিল। এই
দুই বলের ধাক্কাধাক্কির চিহ্ন সিএমবির মানচিত্রের তাপমাত্রার তারতম্য হিসেবে আজও
দেখা যায়। এই তারতম্য থেকে বের করা যাবে বিগ ব্যাংয়ের ঠিক পরে মহাবিশ্ব কত জোরে
প্রসারিত হচ্ছিল। আর সেটা থেকে কসমোলজির স্ট্যান্ডার্ড মডেল ব্যবহার করে জানা যাবে
হাবল ধ্রুবক বা বর্তমান প্রসারণ হার। মহাবিশ্বের সূচনা ও বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে
এই স্ট্যান্ডার্ড মডেল অন্যতম ভালো ব্যাখ্যা দিতে পারে।
কিন্তু তাতে যে
সমস্যা একটি রয়ে গেছে তা হচ্ছে, কাছের ছায়াপথগুলোর দূরে সরার গতি থেকে ধ্রুবকটিকে
মাপলে পাওয়া যায় অন্য একটি মান। স্ট্যান্ডার্ড মডেল সঠিক হয়ে থাকলে দুই উপায়ে
পাওয়া মান সমান হওয়ার কথা। এখানেই বিপত্তি, জটিলতা।
এদিকে ইউরোপিয়ান
স্পেস এজেন্সির (ইসা) প্ল্যাঙ্ক উপগ্রহ থেকে প্রাপ্ত সিএমবির উপাত্ত দিয়ে মাপা মান
পাওয়া গেছে ৬৭.৪। ২০১৪ ও ২০১৮ সালে একই মান পাওয়া যায় এভাবে। কিন্তু এই মান
ছায়াপথের বেগ থেকে পাওয়া মানের ৯ শতাংশ কম। ২০২০ সালে আতাকামা কসমোলজি টেলিস্কোপ
ব্যবহার করে সিএমবির পরিমাপ থেকে পাওয়া মান প্ল্যাঙ্কের মানের কাছাকাছি। এতে
প্ল্যাঙ্ক উপগ্রহের বিভিন্ন উৎস থেকে আসা নিয়মতান্ত্রিক সমস্যা না থাকাই প্রমাণ
হচ্ছে। সিএমবির পরিমাপ সঠিক হলে দুটো বিপত্তির সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। ১) হয়
ছায়াপথের বেগ পরিমাপের যন্ত্রপাতি ভুল অথবা ২) কসমোলজির স্ট্যান্ডার্ড মডেল সঠিক
নয়।
শিকাগো
ইউনিভার্সিটির জ্যোতিঃপদার্থবিদ ওয়েন্ডি ফ্রিডম্যান এই হাবল ধ্রুবকের মান বের করতে
করতেই জীবন কাটাচ্ছেন। তিনি ও তাঁর সঙ্গীরা এ জন্য “সিফিড বিষম” নামে একধরনের
নক্ষত্রের অনুসরণ করছেন। ফ্রিডম্যানই প্রথম হাবল স্পেস টেলিস্কোপের উপাত্ত থেকে
প্রাপ্ত সেফাইড বিষম তারার উপাত্ত থেকে হাবল ধ্রুবকের মান বের করেন। ২০০১ সালে
প্রাপ্ত মান ছিল ৭২ একক। এরপর অন্য একটি দল একই পদ্ধতিতে মান পায় ৭৪ একক। কয়েক মাস
পরই আরেকটি দল পেল ৭৩।
উল্লেখ্য, ১০০ বছর
আগে জ্যোতির্বিদ হেনরিয়েটা লেভিট এ নক্ষত্রগুলো আবিষ্কার করেন। কয়েক দিন বা
সপ্তাহের ব্যবধানে এ নক্ষত্রগুলোর উজ্জ্বলতায় পরিবর্তন ঘটে যায়। লেভিট নক্ষত্রের
উজ্জ্বলতার স্পন্দন কাজে লাগিয়ে নক্ষত্রের প্রকৃত উজ্জ্বলতা বা দীপ্তি নির্ধারণ
করে নক্ষত্রটি পৃথিবী থেকে ঠিক কতটা উজ্জ্বল দেখায় অর্থাৎ দূরত্বের সঙ্গে কতটা
অনুজ্জ্বল হচ্ছে, সেটা থেকে নক্ষত্রের নিখুঁত দূরত্ব পরিমাপ করেন।
এই পরিমাপগুলো
সঠিক হয়ে থাকলে হয়তো মহাবিশ্ব স্ট্যান্ডার্ড মডেলের অনুমানের চেয়ে জোরে প্রসারিত
হচ্ছে। তার মানে মহাবিশ্বের মৌলিক বৈশিষ্ট্য জানার জন্য আমাদের সেরা হাতিয়ার এই
মডেলকে সংশোধন করতে হবে। এটা হবে বড় একটি ঘটনা। ফ্রিডম্যানের মতে, এর অর্থ হচ্ছে
মডেলে কিছু একটার ঘাটতি আছে।
স্ট্যান্ডার্ড
মডেল ভুল মানে অনেক কিছু ভুল। মহাবিশ্বের উপাদান বস্তু সম্পর্কে আমাদের ধারণা হয়ে
যাবে ভুল। সাধারণ বস্তু, ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি ও বিকিরণ সম্পর্কে আমাদের
ধারণাগুলো ভুল প্রমাণিত হবে। আর মহাবিশ্বের বয়স আমরা এত দিন যা ভেবেছি, তার চেয়ে
হবে কম।
প্রিন্সটন
ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্বিদ র৵াচেল বিটনের মতে, হাবল ধ্রুবকের পরিমাপে প্রাপ্ত
মানের পার্থক্যের আরেকটি ব্যাখ্যা হতে পারে। আমরা মহাবিশ্বের যে অংশে বাস করছি, তা
হয়তো বাকি অংশ থেকে ভিন্ন। আর সে কারণেই পরিমাপে ভুল হচ্ছে।
এমতাবস্থায় স্ট্রিং থিওরিতে মহাবিশ্বের যে
বহুমাত্রিক ধারণা রয়েছে তা উপরোক্ত বর্ণনার আলোকে সুস্পষ্ট প্রতীয়মান।
Comments
Post a Comment